অল্প টাকায় র‌্যাসাসি’র রাইস বোল দিয়ে লাঞ্চ

পকেটে টাকা কম থাকলেই যে ভোজনরসিকরা খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে ওঠে ব্যাপারটা এমন না। ব্যাপারটা হচ্ছে, টাকা কম থাকলে তারা খুঁজে বের করে, কম দামেই কী কী খাওয়া যায়। আপনারা আমাদের গালি দিয়ে পেটুক বলতেই পারেন, তবে আমরা নিজেদের ভালোবেসে বলি ভোজনরসিক। আমরা টাকা কীভাবে খরচ করবো, সেই হিসেবের শুরুতেই থাকে খাবার। সেজন্যই টাকা কম থাকলেও খাওয়া আটকে থাকে না।

তেমনই এক অভাবের দিনে খাওয়া রাইস বোলের গল্প বলি আজ। সেদিন গিয়েছিলাম ক্যাম্পাসে। ফাইনাল পরীক্ষাকে সামনে রেখে ফরম পূরণ শুরু হয়ে গেছে তখন। ফরম পূরণ করা মানেই তো পকেটের বারোটা বাজা। একগাদা টাকা খরচ করে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে গেলাম বেইলী রোড।

নাহ্, ঘুরতে না, কাজ ছিলো ওদিকে। কিন্তু সমস্যা তো একটাই। বেইলী রোড গেলে তো খালি মনে হয়, কতদিন না খেয়েই আছি। খাবারের ঘ্রাণে পৃথিবীর আর সব তো ভুলেই যেতে হয়।

রাইস বোল; Source: লেখিকা

আমিও ভুলে গিয়েছিলাম আমার পকেট তখন ফাঁকা। ক্ষুধাকে পাত্তা দিলেই সমস্যা। কিন্তু ওই যে, ভোজনরসিকরা কী আর এসব মানে! টাকা কম মনে পড়তেই ভাবতে লাগলাম, কম দামে পেট ভরে কী খাওয়া যায়।

তখন একবারে ভরদুপুর, গ্রীল-নান খেয়ে দিন পার করে দিতেও ইচ্ছে করছিলো না। এসব ভাবতে ভাবতেই হাঁটছিলাম। বিএফসির সামনে যেতেই হৃদয় যেন নেচে উঠলো। নতুন একটা রেস্টুরেন্ট, এতোদিন খেয়াল করা হয়নি। সেখানে ৯৯ টাকায় রাইস বোল পাওয়া যায়। যদিও রাইস বোল তেমন পছন্দ করি না, কিন্তু তখন তো আর উপায় নেই।

রেস্টুরেন্টটার নাম “র‌্যাসাসি” (Rassasy)। একবারেই নতুন ছিলো তখন। সেভাবে বেইলী রোডের রেস্টুরেন্ট জগতে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। তবে তাদের চেষ্টা আছে, বোঝা যায় একদিন র‌্যাসাসিও আর পাঁচটি জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টের মতোই হয়ে উঠবে।
বাইরে রাইস বোলের বিজ্ঞাপন দেখেই ঢুকেছিলাম। তাই ওয়েটার অর্ডার নিতে আসলে আর দেরি না করে অর্ডার দিয়ে দেই। খাবার আসার আগপর্যন্ত মেন্যু কার্ডটা দেখতে থাকি। এরপর সেখানে গিয়ে কী খাবো তার হিসেব মেলাতে।

র‌্যাসাসি; Source: লেখিকা

অর্ডার করার দশ মিনিট হওয়ার আগেই খাবার দিয়ে যায় ওয়েটার। রাইস বোল বলতে গেলে আমার অপন্দের একটি খাবার। রাইস বোলের চেহারাটাই কেন যেন ভালোলাগে না আমার! কিন্তু র‌্যাসাসি’র রাইস বোলের জুসি- জুসি চেহারাটা দেখেই ভালো লেগে গিয়েছিলো।

অপছন্দের খাবার তো প্রথমে দর্শনদারীতে পাশ করেই ফেললো, এরপর গুণ বিচারের পালা। আর সেই গুণ বিচার করতেই যখন এতকিছু, তখন আর বাটি সামনে পেয়ে খালি মুখে বসে থাকা যায় না। তাই শুরু করে দিলাম গুণ বিচার পর্ব।

বাটি ভর্তি রাইস বোলের প্রথম লেয়ারে ছিলো সস আর মেয়োনেজের এক সুস্বাদু মিশ্রণ। এরপর একে একে সবজি, মাংস আর ফ্রায়েড রাইস মিলিয়ে ভর্তি বাটি। চামচ দিয়ে নেড়ে সব উপাদানগুলো মিশিয়ে নিলাম খাওয়ার আগে।

যেহেতু রাইস বোলে আলাদা কোনো সবজি বা মাংস ছিলো না। সবকিছু এক সাথে মিশিয়ে প্রথম চামচটা মুখে দিতেই মনে হলো এতো কম টাকায় এ তো বেশ ভালো খাবার! দামটা বেশি হলে হয়তো মনে হতো সব টাকা জলে ফেললাম। কিন্তু কম দামে এমন মজাদার একটা খাবার পেলে আর আফসোস থাকে না।

রেস্টুরেন্টের বাইরের দিকটা; Source: লেখিকা

খেতে খেতে হঠাৎ মনে হলো, আরেকটু সস হলে আরো বেশি ভালো লাগবে। তাই ওয়েটারকে বলার পর সস দিয়ে যায় আরো। আমি আরো খানিকটা সস মিশিয়ে নিই বাটিতে। অনেকে বলে থাকে, সস দিলে নাকি খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়।

আমার হিসেব আলাদা। আমার মতে অখাদ্য জাতীয় ঝাল খাবারেও হালকা সস মিশিয়ে মুখে দেয়ার যোগ্য করা যায়। তাই সস মিশিয়ে আরো আয়েশ করে খেলাম। আফসোস লাগলো অল্পক্ষণের মধ্যেই খাওয়া শেষ দেখে। পরিমাণে কমই ছিলো রাইস। আর এমনিতেও তো সব রাইস বোলেই রাইস কমই থাকে।

পরিমাণে অল্পও সেভাবে বলা যায় না। দাম অনুযায়ী ঠিকই ছিলো। রাইসে মাংসের পরিমাণ ছিলো একবারেই কম। কয়েক টুকরো মাংস পেয়েছিলাম মাত্র। তবে স্বাদের বিবেচনায় এসব মাথা থেকে বাদ দেয়াই যায়। রাইস বোল পছন্দ করি না, তবুও র‌্যাসাসিতে আবার খাবো ভেবেছি।

কোনো একটা খাবার খেয়ে যদি আবার এটা খাওয়া যায় মাথায় না আসে, তাহলে তো সে খাবার খাওয়াটাই বৃথা। আবার এই রাইস বোলটা খেয়ে আমার রাইস বোলের উপরের বিরক্তিও কমেছে কিছুটা।

দেয়াল লিখন; Source: লেখিকা

নতুন রেস্টুরেন্ট হলেও র‌্যাসাসি’র ভেতরটা বেশ সুন্দর। কফি শপের মতো দেখতে অনেকটা। এর সাজসজ্জা ভালো লাগবে যে কারো। ভেতরে জায়গা একবারেই কম। ছোটর মধ্যে ছিমছাম বলা যায় র‌্যাসাসিকে।

রেস্টুরেন্টের দেয়ালের একটি লেখা আমার খুব পছন্দ হয়েছিলো। “Food is the ingredient that blnds us together.” আসলে ব্যাপারটা এমনই। সবার ব্যস্ততার মাঝে এখন বন্ধুদের সাথে দেখা করার উপলক্ষ্যই হয় খাওয়া বা ঘুরতে যাওয়া। দলবেধে খেতে যাওয়ার ব্যাপারটা আছে বলে হয়তো এখনো আমরা ব্যস্ততার মাঝেও সময় বের করার চেষ্টা করি।

রেস্টুরেন্টটা যেমন নতুন, এর স্টাফরাও মনে হয়েছিলো এই কাজে একবারেই নতুন। বিল দিয়ে একজন দাঁড়িয়ে ছিলো খানিকটা দূরে কোনো কাজ ছাড়াই। শেষে ডেকে এনে বিল দিতে হয়। এমনিতেও ওয়েটারদের কথাবার্তায় মনে হয়েছিলো তারা কাজগুলো এখনো ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারেনি। তবে তাদের কাজ শেখার আগ্রহ ও আন্তরিকতা ছিলো শতভাগ। সেই হিসেবে ভালোই লাগবে আপনার।

সস্তায় লাঞ্চ; Source: লেখিকা

রেটিং

রাইস বোল- ৭/১০

মূল্য

মূল্য মাত্র ৯৯ টাকা। ভ্যাট দিতে হয়নি।

পরিবেশ

র‌্যাসাসি বেশ ছিমছাম একটি রেস্টুরেন্ট। এর ইন্টেরিয়র খুবই সুন্দর। ভালো সময় কাটানো বা আড্ডা দেয়ার জন্য মনমতো একটি জায়গা।

লোকেশন

১ নং সিদ্ধেশ্বরী লেন, বেইলী রোড, BFC এর পরের বিল্ডিং এর নিচতলা।

 

Feature Image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here