ইলিশের খোঁজে ‘ইলিশের বাড়ি’ চাঁদপুরে একদিন

আমরা বাঙালি, আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয় ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। পাতে ভাতের সাথে মাছ না থাকলে আমাদের যেন খাবার হজম হতে চায় না। আর সে মাছ যদি হয় ইলিশ, তবে তো তৃপ্তির ঢেঁকুর একটু বড়ই হয়ে যায়। আজ বলব সেই ইলিশ নিয়ে।

ঢাকার মানুষজন তাজা ও সুস্বাদু ইলিশ খেতে সাধারণত মাওয়া ফেরিঘাটে যেয়ে থাকে। তবে ইলিশ খাওয়ার যাত্রায় একটু ভিন্নতা আনতে চলে যেতে পারেন “ইলিশের বাড়ি” নামে খ্যাত চাঁদপুরে। চাঁদপুর জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনাস্থলে এ জেলা অবস্থিত। ইলিশ মাছের অন্যতম প্রজনন অঞ্চল হিসেবে চাঁদপুরকে ‘ইলিশের বাড়ি’ নামে ডাকা হয়।

ভাজা ইলিশ; Source: লেখিকা

তিন নদীর মিলনস্থলকে বলা হয় ত্রিমোহনা। যার ফলশ্রুতিতে এখানে প্রতিবছর ধরা পরে অসংখ্য ইলিশ। আর এজন্যই চাঁদপুরে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম ইলিশের বাজার। দেশের নানা প্রান্ত থেকে এই ইলিশ বাজারে মানুষ ইলিশ খেতে ও কিনতে আসে। ক’দিন আগে আমরাও গিয়েছিলাম চাঁদপুরের সেই বিখ্যাত ইলিশ খেতে।

বিশুদ্ধ অক্সিজেনের আশায় হুট করেই আমরা ক’জন বেরিয়ে পড়ি। সদরঘাট থেকে উঠে যাই চাঁদপুরের লঞ্চে। আমাদের উদ্দেশ্য তাজা ইলিশের স্বাদ নেয়া হলেও ঢাকা থেকে চাঁদপুরের রাতের লঞ্চজার্নির লোভ সামলাতে পারি না। এককথায় অসাধারণ সেই অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

সর্ষে ইলিশ; Source: লেখিকা

লঞ্চ থেকে নেমে ঘাট এলাকা থেকে বের হতেই হাতের ডানে দেখতে পাবেন মাঝারি মানের একটি হোটেল। নাম “বি আই ডাব্লিউ টি এ ক্যান্টিন খাবার হোটেল”। হোটেলটির সামনে যেতেই চারদিক থেকে ভেসে আসে ভাজা ইলিশের ম ম ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণে জিভে জল আসতে বাধ্য।

হোটেলটির সামনেই সারি সারি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে পিস করে কাটা, মশলা মাখানো ইলিশ মাছের টুকরা ও ডিম। চার ঘণ্টা লঞ্চে জার্নি করে আমরা ক্ষুধার্ত ছিলাম বেশ। তার উপর এভাবে সারি সারি সাজানো ইলিশ দেখে লোভ সামলাতেই হিমশিম খেয়ে যাই আমরা। দ্রুত হাত, মুখ ধুয়ে বসে পড়ি টেবিলে।

ইলিশ খাওয়া চলছে; Source: লেখিকা

এখানে খাওয়ার সুবিধাটা হলো- আপনি আপনার ইচ্ছামতো ইলিশের পিস বেছে নিতে পারবেন। তারা তৎক্ষনাৎ সেটা ভেজে দেবে। ভাজা ইলিশের স্বাদ এককথায় অসাধারণ। মাছটা তাজা ও ফর্মালিনমুক্ত হওয়ায়, ইলিশের আসল স্বাদ ও ঘ্রাণ পাবেন এখানটায়। আর হ্যাঁ, ইলিশ মাছের ডিম ভাজা খেতে ভুলবেন না যেন। অমৃতের মত সেই স্বাদ।

লোভ সামলাতে না পেরে আমরা একেকজন খেয়ে ফেলি দুই থেকে তিন টুকরা ইলিশ মাছ। ইলিশ ভাজা ছাড়াও এখানে পাবেন বিভিন্ন ধরনের ভর্তা ও ভাজি, পাবেন সরষে ইলিশ, ইলিশের ভুনা ও অন্যান্য ছোট মাছের তরকারি। সরষে ইলিশটি তেমন একটা মুখোরচক লাগেনি আমাদের কাছে। তবে স্বাদে ভিন্নতা আনতে খেয়ে দেখতে পারেন। ভুঁড়িভোজের পর ডেজার্ট হিসেবে এখানে পাবেন বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি ও দই।

ইলিশের পর খেতে পারেন এই মিষ্টি; Source: লেখিকা

ইলিশ ভাজা: ৮/১০
সরষে ইলিশ: ৬/১০
ভর্তা ভাজি: ৭/১০
মিষ্টি দই: ৫/১০

মাঝারি সাইজের ইলিশ (পেটির টুকরা ডিমসহ) ১০০ টাকা প্রতি পিস। সরষে ইলিশ প্রতি পিস ৮০ টাকা। ভাত ১০ টাকা প্লেট। বিভিন্ন ধরনের ভর্তা ভাজি ২০-২৫ টাকা।
মোটামুটি ২০০ টাকা বাজেট করলে একদম ভুঁড়িভোজ দিয়ে বাসায় ফেরা যাবে।

সাধারণ মানের অগোছালো হোটেল। তেমন পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন না হলেও খাওয়ার অযোগ্য পরিবেশ না একদমই। লঞ্চঘাটের এলাকা বলে সারাদিনই ভিড় লেগে থাকে, তাই পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে একটু খামখেয়ালি দোকানমালিক। তবে আমি নিশ্চিত, ইলিশ মাছের স্বাদের সুখানুভূতিতে বাকিসব ভুলে যাবেন নিমিষেই।

খাবার হোটেল; Source: লেখিকা

ঢাকার সদরঘাট থেকে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২:৩০ পর্যন্ত আধা ঘণ্টা পর পর চাঁদপুরের লঞ্চ ছেড়ে যায়। তবে সবচেয়ে ভালো হয় ১২টা কিংবা ১২:৩০ এর লঞ্চে করে রওনা দিলে। তাতে ভোরে চাঁদপুরে পৌঁছে যেতে পারবেন। এখানে বলে রাখি, যারা রাতে লঞ্চজার্নি করেননি, তারা এ সুযোগ হাতছাড়া করবেন না কিছুতেই। রাতের লঞ্চযাত্রা সত্যিই খুব অসাধারণ।

লঞ্চের ডেক; Source: লেখিকা

লঞ্চের ডেকে দু’হাত মেলে দাঁড়ালে নিজেকে একমুহূর্তের জন্য হলেও ডানা মেলা পাখি মনে হয়। আর রাতটা যদি হয় জোৎস্না, তবে তো অনুভূতি আকাশ ছুঁয়ে যায়।

লঞ্চ থেকে নেমে টারমিনাল থেকে বের হতেই হাতের ডানে তাকালেই পেয়ে যাবেন হোটেলটি।

চাঁদপুর গেলে অনেকেই ইলিশ খাওয়ার পাশাপাশি ইলিশ কিনতেও চান। সেজন্যে আপনাকে বড় স্টেশন চলে যেতে হবে। ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য বাজার থেকেই বরফ দিয়ে প্যাকিং করে দেবে। আর মাছ কেনার সময় রূপালি রং দেখে কিনবেন। চাঁদপুর বড় স্টেশন মোকামের বেশিরভাগ ইলিশই চাঁদপুরের নয়। এখানে বরিশাল, ভোলা কিংবা সামুদ্রিক ইলিশই বেশি।

চাঁদপুরের ইলিশ চেনার সবচেয়ে সহজ একটি উপায় আছে। এখানকার ইলিশ একেবারে রুপালি রঙের হয়ে থাকে। আর অন্যান্য জায়গার ইলিশে রুপালি রংয়ের সঙ্গে লালচে আভা দেখা যায়। নোনাপানির ইলিশে রুপালি রঙের সাথে লালচে আভা থাকে। মিষ্টিপানি বা নদীর ইলিশ দেখতে চকচকে রুপালি রঙের হয়।

 

Feature Image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here