একটুখানি সুইটসিন কফিজ

আচ্ছা, ব্যাপারটা কি কষ্টের নাকি সুখের, যদি বলি এই ১ বছরের মধ্যে ৭ কেজি অতিরিক্ত ওজন জুটিয়েছি সারাদিন এদিকে-ওদিকে খেয়ে-দেয়ে? শুধু তারাই বুঝবে ব্যাপারটা যাদের দিন কাটে এরপর কি খাওয়া যায়, কোথায় খাওয়া যায়, নতুন কোন আইটেম ট্রাই করা নাকি; এসব চিন্তা করে।

আশেপাশের সবাই বলে আমি নাকি অসুস্থ (দুঃখভারাক্রান্ত একটি দীর্ঘশ্বাস হবে)! আমি শুধু বলি, কিছু কিছু ব্যাপার আছে তোমরা বুঝবে না। সামনে থাকা পছন্দের খাবারের ঘ্রাণের মধ্যে যে ব্যাপারটি আছে, তোমরা স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ তা ধরতে পারবে না।

সুইটসিন কফিজ। source:লেখিকা

অনেকদিন ধরে মরে যাচ্ছিলাম ওয়াফেল খাওয়ার জন্য। কেন জানি এতরকম আইটেম ট্রাই করার পরও এই আইটেমটা কখনো ট্রাই করা হয়নি। রোজার সময়ের কথা, বন্ধুরা মিলে ঠিক করলাম সুইটসিন যাবো। কারণ বাকিদের থেকে শুনেছিলাম যে ওদের খাবার ভালো।

আমি তাদের ফেইসবুক পেইজে মেসেজ দিলাম যে, জায়গা পাওয়ার জন্য আগে থেকে রিজার্ভ করা লাগবে নাকি। কপাল কিছুটা খারাপ ছিল, কিন্তু তার পিছন আবার ভালোও ছিল অনেকটা, যা শেষ পর্যন্ত পড়লে বুঝবেন।

এরপর ঈদ, রোজা চলে গেল, সময়ের কারণে আর যাওয়া হলো না। প্রতিদিনের শান্তিনগর থেকে মিরপুরে ভার্সিটিতে যাওয়া-আসা করতে করতেই জীবনের আধা সময় শেষ। গত ১৭ তারিখ থেকে কোরবানীর ঈদের জন্য ভার্সিটি বন্ধ হতেই রাতে এক ফ্রেন্ডকে বললাম অনেক হয়েছে। কালকে শুক্রবার হবে সুইটসিন ডে। প্ল্যান করতে করতে আর দিন পার করতে পারবো না।

যেই চিন্তা, সেই কাজ। কীসের শরতের গরম, আর কীসের ঘর থেকে বের হওয়ার আলসেমি। আমরা যারা স্টুডেন্ট, আমাদের অনেক শখ থাকলেও পকেটের দিকে তাকিয়ে তা আর হয়ে ওঠে না। সব থেকে কষ্ট খাবারের সাথে ভ্যাটের দাম যোগ করে যখন দেখি হিসাবে মেলে না, তখন শেষে কোকটা নিতে পর্যন্ত চিন্তা করতে হয়!

তো আমি যেহেতু জানি, সুইটসিন মোটামুটি দামের জায়গা, তাই টাকা যেন নষ্ট না হয়, এজন্য শান্তিনগর মোড় থেকে বাসে উঠে পড়লাম। বাস একদম সুউটসিনের সামনেই থামলো,আহা!

লিফটের ৮ তলায় সুইটসিন। দরজা দিয়ে ঢুকতেই যেই ঘ্রাণটা আসে, তাতেই আপনার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। আমি আর আমার ফ্রেন্ড ২ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিলাম এই ঘ্রাণের জন্য। দুধ, কফির এত সুগন্ধ।

যেই শিল্পকর্মের সবাই একটি ছবি তোলে। source: লেখিকা

তারপর চোখ পড়লো তাদের ছোট্ট ছিমছাম জায়গায়। খুব আহামরি বড় না জায়গাটি, কিন্তু অনেক সুন্দর করে ডেকোরেটেড করা। রাস্তার পাশের সিটটার দিকে নজর ছিল, কিন্তু সেখানে একজন নিজের মনে ল্যাপটপ, আর সামনে একটা ওয়াফেল নিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বসেছিল।

আচ্ছা, খেয়াল আছে? আমি যে শুরুতে বলেছিলাম, জায়গা না পাওয়াতে খারাপ যেমন হয়েছিল ভালোও হয়েছিল খানিকটা? এবার আসি সেই গল্পে। সুইটসিন এর কর্তৃপক্ষ সুইট করে আমাকে সেদিন ফ্রি ওয়াফেল এর অফার দিয়েছিলো, কারণ তারা দুঃখিত ছিল যে, তারা আমাকে রোজার সময় জায়গা দিতে পারেনি। আমাদের মতন স্টুডেন্টদের জন্য এর থেকে আনন্দের আর কী হতে পারে!

বলার দরকার নেই যে, সেখানকার স্টাফদের ব্যবহার খুবই ভালো। এসে মেন্যু দিয়ে গেল এবং জিজ্ঞাসা করলো অন্য কিছু লাগবে  নাকি। আমরা এমন অনেক জায়গায়ই যাই যেখানের স্টাফদের ব্যবহার দেখলেই মন খারাপ হয়ে যায়, কিন্তু এখানে একদম ব্যতিক্রম।

এরপর আমি আর আমার ফ্রেন্ড মিলে মেন্যু দেখা শুরু করলাম, যা দেখি তা-ই খেতে ইচ্ছা করে অবস্থা। দাম কিছুটা বেশি। কিন্তু খাওয়ার পর তা নিয়ে আর কোনো কষ্ট ছিল না। আমি আমার যেই ফ্রেন্ডকে নিয়েছি, সে এমন যে, “তুই বল তোর যা ইচ্ছা তাই অর্ডার কর।” আমি কতক্ষণ চিল্লাপাল্লা করলাম যে, কেনো আমার উপর দিয়ে সবসময় ছুরি চালানো হয়? পরে যদি খাবার মজা না হয় কিছু বলাও যাবে না! আমার মতো এই অভিজ্ঞতা কয়জনের আছে?

খাবারের মেন্যু।

মেন্যু নিয়ে অনেক পর্যবেক্ষণ করে ঠিক করলাম ৩টা জিনিস।

১.তিরামিসু ওয়াফেল (ফুল)

২.বিবিকিউ স্যান্ডউইচ উইথ বেকন এন্ড মাশরুম

৩.ফ্রোজেন ল্যাটে

খাবারের বিবরণ

১. প্রথমত, আমি মূলত গিয়েছিলাম তাদের রেড ভেলভেট ওয়াফেল ট্রাই করার জন্য। কিন্তু সেই মুহূর্তে তা ছিল না দেখে একটু মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পরে আমার ফ্রেন্ড বললো, তিরামিসুটা নিই।

প্রথম বাইটটা যখন নিলাম, মনে হলো যেন স্বর্গে আছি! যা ছিল! সার্ভ করা হয়েছিল আইসক্রিম দিয়ে, উফ! কম্বিনেশন,খাবারের ডেকরেশন সব মিলিয়ে: ৯.৫/১০।

২. মূলত স্যান্ডউইচটা বেকন আর মাশরুমের জন্য নেওয়া। সাথে চিপস আর সস দিয়ে পরিবেশন, খুবই ভালো ছিল। যাদের বেকন আর মাশরুম পছন্দ তাদের ভালো লাগবে আশা করি: ৮.৫/১০।

৩. ফ্রোজেন ল্যাটে এইটা মুখে দিতেই মন ভালো হয়ে গেলো আমার ফ্রেন্ডের কারণ ও ল্যাটে ফ্রিক আর ওর ভাষ্যমতে, এটা বেস্ট তাই ও এইটার রেটিং করেছিল: ৯/১০।

এতে ছিল: হ্যাজেল নাট, টফি নাট, ইরিশ, বাটার স্কচ, চকলেট, ক্যারামেল, কুকিজ অ্যান্ড ক্রিম।

 

তিরামিসু ওয়াফেল (ফুল), বিবিকিউ স্যান্ডউইচ উইথ বেকন এন্ড মাশরুম, ফ্রোজেন ল্যাটে। source:লেখিকা

দাম

১. তিরামিসু ওয়াফেল:  ৩৯৭

২.স্যান্ডউইচ: ৪১০

৩.ফ্রোজেন ল্যাটে: ২৯৭

(সাথে ১৫% ভ্যাট)

ঠিকানা

৮ তলা, নাভানা জি.এইচ.হাইটস, ৬৭, সাত মসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ১২০৯, ঢাকা, বাংলাদেশ।

শেষ করছি একটা ছোট্ট কথা দিয়ে, আমি মূলত সুইটসিন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কারণ আমার তার আগের রাতে অনেক মন খারাপ ছিল আর শুধু খাবারই পারে আমার মনকে ভালো করতে। এটা আমার ফ্রেন্ডটার জানা ছিল তাই সে আমাকে বলেছিল, ” We will have the best waffles in town today & things will be alright”

আর সত্যিই, সুইটসিন থেকে বের হওয়ার পর আমার মনটা একদম ভালো হয়ে গিয়েছিল।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here