একদিন বিকেলে থাই স্যুপের খোঁজে দক্ষিণ বনশ্রীতে

অন্য আর সব রোগের মতো খাই-খাইও আমার মতে একটা রোগের পর্যায়েই পড়ে। কারণ কী খাবো, কী খেলে ভালো লাগবে, কতোটা খাবো এসব চিন্তা মাথায় ঘোরে সারাক্ষণই। আমিও এই রোগের কঠিন ধরনের রোগী। খাওয়া-দাওয়ার চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুরতে থাকি সবসময়। খাওয়া আমার কাছে একটা প্রিয় নেশার মতোই। সুযোগ পেলেই তাই ঘুরে ঘুরে এখানে-ওখানে খেতে যাওয়া হয় নিয়মিত।

একদিন হুট করে দক্ষিণ বনশ্রী গেলাম এক বন্ধুর বাসায়। বাসায় গিয়ে খাওয়ার পরেও মনে হলো, ওদিকে যেহেতু সবসময় যাওয়া হয় না তাই বাইরে গিয়ে কিছু খেয়ে আসি। ভাবনাটা মাথায় আসতে দেরি হয়েছে, তবে আসার পর আমাদের আর বেড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। বন্ধু আর এক আপু ছিলো সাথে। তিনজন মিলে বেড়িয়ে গেলাম চা আর সাথে হালকা কিছু খাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। তবে সেই চা পানের ইচ্ছেটা আর শুধু চায়ে আটকে থাকেনি। চায়ের বদলে শেষে ঠেকেছিলো গিয়ে স্যুপে।

বাটিভর্তি থাই স্যুপ; Source: লেখিকা

দিনটা ছিলো ঈদের ঠিক পরের দিন। তাই অধিকাংশ রেস্টুরেন্ট ছিলো বন্ধ। কী খাবো, কোথায় খাবো ভাবতে ভাবতে চলে গেলাম হুট করে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টের সামনে। চাইনিজের ভারী কোনো খাবার খাওয়ার একেবারেই ইচ্ছে ছিলো না। তবে আশেপাশে আর কোনো রেস্টুরেন্ট খোলা না থাকায় ভরসা ছিলো ওটাই।

আমরা গিয়েছিলাম দক্ষিণ বনশ্রীর “EFC Thai Chinese & Resturent” এ। ভারী কোনো খাবার ইচ্ছে ছিলো না দেখে আমরা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আলোচনা করছিলাম ভেতরে ঢুকবো কিনা। ভেতর থেকে ওয়েটার আমাদের দেখে বাইরে এসে ভেতরে বসে মেন্যু দেখার আমন্ত্রণ জানায়। আমাদের পরে পছন্দ না হলে অর্ডার না করলেও কোনো সমস্যা নেই। প্রথমেই এমন ব্যবহার খুব ভালো লাগলো। কোথাও খাবার যতোই সুস্বাদু হোক, ব্যবহার ভালো না হলে সেখানে দ্বিতীয়বার যাই না আমি।

স্যুপের সাথে দেয়া সস আর মরিচের ঝাল পানি; Source: লেখিকা

রেস্টুরেন্টের বাইরেই মোটামুটি ঠিকঠাক করেছিলাম, স্যুপ খাবো। আর স্যুপ খাবো মানে সেটা সাধারণত থাই স্যুপই হয়। ব্যক্তিগতভাবে থাই স্যুপ ছাড়া অন্য কোনো স্যুপ আমি সেরকম পছন্দ করি না। আমার সাথে থাকা দুইজনও ছিলো তেমনি। মেন্যুতে থাই ছিলো মোট ছয় রকমের। সেখান থেকে আমরা তাদের স্পেশাল থাই স্যুপ রেগুলার অর্ডার করি। স্যুপটা তিনজনে খাওয়ার উপযোগী হওয়ায় একটাই অর্ডার করি। ওয়েটার আমাদের থেকে মিনিট দশেক সময় চেয়ে নেয়।

ছোটখাটো হলেও রেস্টুরেন্টের ভেতরটা ছিলো বেশ ছিমছাম। চাইনিজ রেস্টুরেন্টের আধো আলো, আধো ছায়া ব্যাপারটা এমনিই সুন্দর। আর ডেকোরেশান সুন্দর থাকলে এমনিতেই ভালো লাগে। আমরা বসে গল্প করতে করতে অপেক্ষা করছিলাম। ভালো ভালো গানও বাজাচ্ছিলো তারা। এই আলো-আঁধারির আর সাথে গান থাকা পরিবেশটা কেমন যেন নস্টালজিক করে দেয়ার মতো।

আলো-আঁধারিতে; Source: লেখিকা

পনের মিনিট হওয়ার আগেই স্যুপ পরিবেশন করে দেয় আমাদের। থাই স্যুপের রেগুলার ডিশটা প্রায় ভরা ছিলো স্যুপ দিয়ে। আমরা তিনজন শুধু স্যুপ খেয়েও পুরোটা শেষ করতে পারিনি। তবে স্বাদে খুব আহামরি কিছু ছিলো বলবো না। স্যুপটা যথেষ্ট পাতলা ছিলো। আলাদা টমেটো সস নিয়ে আমি অনেকটা ঘন করে নিয়েছিলাম। একেকজনের টেস্ট তো একেক রকম। আমাদের মধ্যে একজনের আবার স্যুপটা খুবই ভালো লেগেছিলো। তবুও শেষ করতে পারিনি, পরিমাণটা এতোই বেশি ছিলো।

“EFC Thai Chinese & Resturent” এর স্পেশাল থাই স্যুপ রেগুলারে ছিলো- মুরগি, চিংড়ি, মাশরুম আর থাই স্যুপের অতি প্রয়োজনীয় উপাদান লেমন গ্রাস। মাশরুম তেমন বেশি ছিলো না স্যুপে, তবে মুরগি আর চিংড়ি ছিলো অনেক। প্রতিবার চামচের সাথে হয়তো মুরগি বা চিংড়ি উঠে এসেছেই। এই ব্যাপারটা খুব ভালো ছিলো সেখানের। অনেক রেস্টুরেন্টে দেখা যায় স্যুপ বলতে শুধু ঝোলটা ফেলে রাখে, আর কিছুই তেমন থাকেই না।

স্যুপের ডিশে স্যুপ; Source: লেখিকা

স্যুপটা খেতে খুব খারাপ লেগেছিলো বলবো না, তবে খুব ভালোও লাগেনি৷ এলাকার মধ্যে চাইনিজ রেস্টুরেন্ট বলে দক্ষিণ বনশ্রীর লোকজনের জন্যে বেস্ট। দূর-দূরান্ত থেকে খেতে গেলে অবশ্য আফসোস হতে পারে। আর আমরা তো শুধু স্যুপ খেয়েছিলাম। পাশের টেবিলের লোকজনের মুখ থেকে শুনেছিলাম, ওখানের বাকি চাইনিজ আইটেম যেমন- ফ্রাই রাইস, চিকেন, সিলজিং, বিফ ইত্যাদি বেশ ভালো। উনারা নাকি প্রায়ই খেতে আসেন পুরো পরিবার নিয়ে।

কম টাকায় চাইনিজ রেস্টুরেন্টে গিয়ে স্যুপ খেতে হলে দক্ষিণ বনশ্রী গিয়ে ট্রাই করে দেখতে পারেন, মাংস আর চিংড়ির পরিমাণ আপনাকে আশাহত করবে না। চাইনিজ রেস্টুরেন্টে রাতের খাবারটা খেতেই বেশি ভালো লাগবে। একদিন পুরো পরিবার, সঙ্গী বা বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন “EFC Thai Chinese & Resturent” থেকে।

থাই স্যুপের মেন্যু; Source: লেখিকা

 

রেটিং

স্পেশাল থাই স্যুপ- ৭/১০

 

মূল্য

স্যুপটার দাম ছিলো ৩৫০ টাকা মাত্র। তিনজনে খাওয়ার উপযোগী হলেও তিনজনে খেয়ে শেষ করা যায় না এমন৷ চারজন মিলে ভালোভাবেই খেয়ে নিতে পারবেন স্পেশাল এই থাই স্যুপটি।

বিল; Source: লেখিকা

 

পরিবেশ

চাইনিজ রেস্টুরেন্টের পরিবেশকেই আমার নস্টালজিক হওয়ার মতো পরিবেশ মনে হয়। এটাও তেমনি ছিলো। আলো-আঁধারির খেলা আর প্রিয় কোনো গান আপনাকে ভালো লাগাতে বাধ্য করে। রেস্টুরেন্টের সবার ব্যবহার ছিলো খুবই ভালো। এটা এই রেস্টুরেন্টের একটা উল্লেখযোগ্য দিক।

এমন সুন্দর পরিবেশ ছিলো রেস্টুরেন্টির; Source: লেখিকা

 

লোকেশন

” EFC Thai Chinese & Resturent” টি হলো দক্ষিণ বনশ্রীতে। দক্ষিণ বনশ্রীর “K-block” এ ঠিক শাপলা বিল্ডিং এর সাথে। ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে চলে আসতে পারেন মেরাদিয়া, বনশ্রী। সেখান থেকে রিকশাকে দক্ষিণ বনশ্রী শাপলা বিল্ডিং নিয়ে যাবে আপনাকে। ভাড়া নিবে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা। আবার লেগুনা দিয়েও যেতে পারেন। লেগুনার ভাড়া মাত্র ৫ টাকা। তবুও যদি চিনতে অসুবিধা হয়, তাহলে বনশ্রীর পরিচিত কারো সাহায্য নিতে পারেন। আর গুগল ম্যাপ তো আছেই।

 

Feature image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here