এল ক্লাসিকো বার্গার

বার্গার, দুই টুকরো বানের মাঝে চিকেন পেটি বা চিকেন কিমা। জাস্ট এইটুকুই লাগে আমার কাছে একটা স্বর্গীয় খাবারের বর্ণনা দিতে। ‘বার্গার পাগল’ যাকে বলে যায় সেটা বোধহয় আমিই।

দু’দিন বার্গার না খেলেই যেখানে মনে হয় এক কোটি বছর বার্গার খাই না, সেখানে অনেকদিন সময়ের অভাবে কোন রেস্টুরেন্টে যাওয়াও হচ্ছিলো না, বার্গারও খেতে পারছিলাম না।

কয়েকদিন ধরেই মনকে আর বেধে রাখতে পারছিলাম না। বার্গার খেতে খুব ইচ্ছে করছিলো। হঠাৎ ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে একটা বার্গারের ছবি চোখে পড়লো। দেখলাম, এল ক্লাসিকো রেস্টুরেন্টে তাদের বর্ষপূর্তি হওয়ার উপলক্ষ্যে ১১% ছাড় থাকবে। সেই সাথে পাওয়া যাবে ১ জনের জন্য ১ টাকায় কোল্ড কফি।

পোস্ট দেখার পর দিন গুণে দেখলাম দু’দিন বাদেই অফারের ডেট। অপেক্ষার প্রহর শেষে বান্ধবীকে নিয়ে চলে গেলাম এল ক্লাসিকোতে। গিয়ে ঢুকতেই একটা বড়সড় ধাক্কা খেলাম। এত্ত মানুষ! ১ টাকার কফি খাওয়ার জন্য শেষমেশ সবাইকে লাইন ধরতে বললো রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ।

আমি যেহেতু বাসা থেকেই প্ল্যান করে গিয়েছি, বার্গার খাবো তাই ভিড় ঠেলেই ভেতরে গিয়ে বসলাম। এল ক্লাসিকোর ভেতরের পরিবেশ জাস্ট অসাধারণ।

‘এল ক্লাসিকো’ নামটা শুনলেই প্রথমে যে শব্দটা মাথায় আসে তা হলো ফুটবল। মূলত ফুটবলে ক্লাব পর্যায়ের খেলায় দুইটা দল- বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ এর মধ্যে স্প্যানিশ ফুটবল লীগ, লা লিগায় যে ম্যাচটি খেলা হয় তার নাম এল ক্লাসিকো।

নাম শুনেই যা বোঝা যায় রেস্টুরেন্টটির সাজ সজ্জাকরণও নামের ব্যতিক্রম হবে না। ফুটবল কিংবা বার্সেলোনা ও রিয়াদ মাদ্রিদ; এই দুটো টিম এর থিমের আদলেই তৈরি এই রেস্টুরেন্টটি।

এল ক্লাসিকো রেস্টুরেন্টে বাইরে বসার জায়গা; Source: লেখিকা

দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকার আগেই দেখবেন সামনের বারান্দায় গোল পোস্টের নেট দিয়ে ঘেরাও করে দুইটি বসার জায়গা রয়েছে। এবার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেই অবাক হবার পালা। আপনি এক মুহূর্ত ভাববেন, কোথায় আসলেন! কোন ফুটবল খেলার মাঠে নাকি কোন রেস্টুরেন্টে!

পুরো রেস্টুরেন্টটির ফ্লোর জুড়ে রয়েছে নরম ঘাসের পরশ। আসলে ফ্লোর বললে ভুল হবে। বলতে হবে- আপনি কোন দুর্বাঘাসের মাঠে বসে আছেন! একটু পরেই কোন ম্যাচ শুরু হবে। দেয়ালগুলো সাজানো হয়েছে বিভিন্ন খেলোয়ারদের ছবি দিয়ে।

সামনের বড় দেয়ালে রয়েছে মেসি ও রোনালদোর একটি করে পেইন্টিং। একটু আগালেই দেখা যায় ডেভিড বেকহাম, রোনালদিনহোসহ আরও খেলোয়ারদের ছবি। আর নিচে তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র ফুটবল। আপনি চাইলে ফুটবল নিয়ে আপনার সকল ধরনের কারিশমা দেখিয়ে দিতে পারেন রেস্টুরেন্টটিতে বসে।

ভেতরের ওয়াল পেইন্টিং, Source: লেখিকা

দরজা দিয়ে ঢুকেই একটু সামনে এগোলে তাদের কাউন্টার। রেস্টুরেন্টটির নিয়ম হলো পে ফাস্ট সার্ভিস। আমি ভেতরে গিয়ে কোনরকমে একটা জায়গা ম্যানেজ করে বসলাম।

মানুষ বেশি হওয়ার পরও আমরা বসার পর ওয়েটার মেন্যু কার্ড দিয়ে গেল। যেহেতু সব রেস্টুরেন্টের সব বার্গার একবার করে চেখে দেখতে হবে, তাই মেন্যু কার্ডে খুঁজতে লাগলাম এই রেস্টুরেন্টের আর কোন বার্গারটা এখনো খাওয়া হয়নি।

বান্ধবী বললো, ‘এল ক্লাসিকো বার্গার’ অর্ডার দিতে। আর সাথে তো ১ টাকার কোল্ড কফি আছেই। এমনিতেই এদের কোল্ড কফির সুনাম অনেক। যতদিন এল ক্লাসিকোতে এসেছি, কোল্ড কফি মাস্ট খেয়েছি।

কাউন্টারে গিয়ে অর্ডার করে এসে জায়গায় বসে চারপাশ দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, কতোটা জনপ্রিয়তা থাকলে মানুষ এতো ভিড় ঠেলেও এখানটায় আজকে খেতে এসেছে। আর ১ টাকায় আসলে কতটুকুন কফি দেবে এরা যে, এতো এতো মানুষ লাইন ধরে দাড়িয়ে আছে।

ভেতরের দেয়ালে টাঙ্গানো ছবির ফ্রেম; Source: লেখিকা

আমার এ ভাবনায় একটু পরেই চিড় ধরলো। ওমা! এতো দেখি একেবারে এদের রেগুলার কোল্ড কফির মতোই টেস্ট আর পরিমাণও খুব কম না। বরং আমি সন্তুষ্টই হয়েছিলাম। হ্যাঁ, ততক্ষণে আমার কোল্ড কফি চলে এসেছিলো টেবিলে।

কোল্ড কফি পেয়েই আমি চুমুক দিয়ে দেখলাম, আসলে স্বাদ কি ঠিক আছে নাকি স্বাদ কমিয়ে অফারে দিচ্ছে! টেস্ট সত্যিই রেগুলার কফির মতোই একেবারে পারফেক্ট।

 

১ টাকার কফি; Source: লেখিকা

কফি নিয়ে বার্গারের জন্য প্রায় মিনিট ১০ এর মতো অপেক্ষা করে করে যখন বোর হচ্ছিলাম, তখন দেখি এদের একটা দেয়ালে বুক সেলফের মতো একটা তাক আছে। ওখানে আবার খুব ভালো কিছু বইও দেখতে পেলাম।

ততোক্ষণে বার্গার আমার টেবিলে চলে এসেছে। বার্গার দেখে সত্যিই মন খুব ভালো হয়ে গিয়েছিল। বার্গার দেখতে খুবই চমকপ্রদ ছিল।

খাবারের বিবরণ

এল ক্লাসিকো বার্গার

স্পেশাল বার্গার হিসেবে মেন্যুতেই বলা ছিল কী কী থাকবে। ক্রিস্পি চিকেন স্ট্রাইপস, বিবিকিউ চিকেন, স্লাইস চিজ, অনিওন রিং, টমেটো, লেটুস পাতা, নিজস্ব বানানো স্পেশাল সস ও চিলি টমেটো সসের সংমিশ্রেণে বানানো হয়েছিল বার্গারটি।

এল ক্লাসিকো বার্গার; Source: লেখিকা

 

বার্গারটি দেখতে খুবই সুন্দর এবং এটি ছিল একটি ডাবল লেয়ার বার্গার। লেয়ারের ওপরের পার্টে চিকেন স্ট্রাইপস ছিল, তারপর চিজের স্লাইস, অনিওন রিং, লেটুস পাতা দিয়ে মাঝে আবার একটি বানের টুকরা দিয়ে তার নিচে বিবিকিউ চিকেনের কিমার ওপর তাদের নিজস্ব বানানো সস আর চিলি সস দিয়ে পরিবেশন করেছিলো বার্গারটি।

প্রথমে বার্গার সামনে পেয়ে বানের টুকরো উঠিয়ে চিকেন স্ট্রাইপস মুখে দিয়ে দেখলাম। চিকেন স্ট্রাইপ খুবই মজাদার ছিল। ফ্রাইটাও ঠিকঠাক ছিল। একটা জুসি ভাবও ছিল। এটুকুন পর্যন্ত বার্গারটি একেবারে ঠিকঠাক। আমি ৯/১০ দেব।

কিন্তু বিপত্তি বাধল পরের লেয়ারের বিবিকিউ চিকেন কিমা মুখে দেবার পর। আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। চিকেনের চেয়ে কেমন যেন একটা ভর্তা টাইপ স্বাদ পাচ্ছিলাম। তবে সাথে টমেটো চিলি সস ছিল। সস দিয়ে কোনরকমে খেয়ে শেষ করেছিলাম এল ক্লাসিকো বার্গার।

কোল্ড কফি

এদের কোল্ড কফি বরাবরই ভালো। খুব জোড়গলায় বলতে পারি, শহরের বেস্ট কফি। দুধ কফির সংমিশ্রণে এক অদ্ভুত রকমের মজাদার স্বাদ। একবার খেলে পরেরবার এসে আবার চেখে দেখবেন, এই গ্যারান্টি দিতে পারবো।

এল ক্লাসিকো রেগুলার কোল্ড কফি; Source: লেখিকা

দাম

এল ক্লাসিকো বার্গার- ২৬০ টাকা
রেগুলার কোল্ড কফির দাম- ৯০ টাকা

অফার থাকায় আমি ১ টাকা দিয়ে খেয়েছি। আর বার্গারের দামে ১১% ছাড় পেয়েছি।

 

এল ক্লাসিকো মেন্যু কার্ড; Source: লেখিকা

রেটিং

এল ক্লাসিকো বার্গার- ৭/১০
কোল্ড কফি- ৯.৫/১০

লোকেশন

শহরের যেকোনো জায়গা থেকে রিকশা নিয়ে কান্দিরপাড় চলে আসবেন। কান্দিপাড়ের সিটি মার্কেটের ২য় তলায় উঠেই পেয়ে যাবেন এল ক্লাসিকো রেস্টুরেন্টটি।

 

Feature Image:লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here