কুমিল্লার দাওয়াত রেস্টুরেন্টে একদিন

ছোটভাইয়ের শারিরীক অসুস্থতাজনিত কারণে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যাপক দৌড়াদৌড়ির পর পেটের মধ্যে ইঁদুর বাবাজী উসাইন বোল্ট গতিতে যখন দৌড়ানো শুরু করলো তখন আর বসে থাকার জো নেই।

প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়েই হাসপাতাল থেকে বের হলাম। কী খাবো চিন্তা করতেই পাশে একটি রেস্টুরেন্ট চোখে পড়লো। আগে কখনো এখানে যাওয়া হয়নি। তাই ভাবলাম যেয়ে দেখি কী অবস্থা।

খোলা আকাশের নিচে বসে মুরগির রানে কামড় বসাচ্ছেন আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে আপনার প্রিয় কোনো গান, ভাবতেই কেমন সুখ সুখ লাগতেছে, তাই না? আসলে রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকে দেখি বাইরে ভেতরে দু’জায়গাতেই বসার জায়গা রয়েছে।

 

দাওয়াত রেস্টুরেন্টের প্রবেশ পথ; Source: লেখিকা

আমার কাছে ভেতর থেকে বাইরের জায়গাটিই আকর্ষণীয় লাগলো, তাই এদিকেই বসে গেলাম। তাছাড়া ভেতরে খানিকটা গরমও ছিল। খোলা আকাশের নিচে বসেই প্রথমেই কিছু ছবি তুলে নিলাম আমরা। দু’ চারটে সেলফি তুলতে তুলতে ওয়েটার এসে জিজ্ঞেস করলো কী খাবো। সাথে মেন্যু কার্ড দিয়ে গেল।

মেন্যু কার্ড দেখতে দেখতে আমার এক বান্ধবী হাজির হলো। ওয়েটারকে ডেকে অর্ডার দিলাম। ভাই অর্ডার করলো বিফ বিরিয়ানি। আমি অর্ডার করলাম চিকেন চাপ, চিকেন গ্রিল আর বাটার নান। বান্ধবী অর্ডার করলো হালিম। সাথে তিন জনের জন্য বোরহানি।

অর্ডারের মিনিট দুই এর মধ্যেই বিরিয়ানি দিয়ে গেলো টেবিলে। কিছুক্ষণ পর নান, চিকেন চাপ, চিকেন গ্রিল আর হালিম, সাথে বোরহানিও দিয়ে গেল।

প্রচণ্ড ক্ষুধা থাকার কারণে সাথে সাথেই খাবারের উপর হামলে পড়লাম সবাই।

খাবারের বিবরণ

১. বিফ বিরিয়ানি

বিফ বিরিয়ানি; Source: লেখিকা

 

ছোট ভাই খেয়ে বললো, বিরিয়ানির স্বাদ ভালোই। অনেকগুলো ছোট টুকরো করা গরুর মাংস ছিল বিরিয়ানিতে। একটি ডিমও ছিল। সুগন্ধি পোলাওয়ের চালে তৈরি বিরিয়ানির সাথে সালাদ হিসেবে ছিল শসা ও লেবু।

বিরিয়ানির পরিমাণ একজনের জন্য যথেষ্ট ছিল। ভাইকে জিজ্ঞেস করায় ভাই বললো, মাংস সেদ্ধ হয়েছে বেশ ভালোভাবেই, মাংসের মধ্যে মশলাও যথাযথ ছিল। সব মিলিয়ে আপনার দুপুরের খাবারের জন্য ‘দাওয়াত রেস্টুরেন্ট’ এর বিফ বিরিয়ানি একটি আদর্শ খাবার।

 

২. চিকেন চাপ

চিকেন চাপ; Source: foodies gossip (comilla)

 

চিকেন চাপের সাইজ দেখে প্রথমেই আমি হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম। এতো ছোট সাইজের চাপ দেবে আশা করি নাই। যদিও এর আগে এই রেস্টুরেন্টের চাপের অনেক সুনাম শুনেছিলাম।

যা-ই হোক, হতাশ হয়ে বসে না থাকে চাপ থেকে খানিকটা ছিঁড়ে মুখে দিলাম। মুখের দেওয়ার পর আমার হতাশা কিছুটা কমেছিল। চাপের স্বাদ ভালো ছিল।

চাপ ভাজাও হয়েছিল ঠিকভাবে। মুরগির মাংস খুব ভালোভাবেই সেদ্ধ হয়েছে। মশলাগুলোও পুরো মাংসে ভালোভাবেই মিশেছে। নানের সাথে চিকেন চাপ খেতে এ কারণেই খুব ভালো লেগেছে।

চিকেন চাপের সাথের তেতুলের চাটনির কথা আলাদা করে বলতেই হয়। বেশ দারুণ ছিল চাটনিটি খেতে। আর সালাদ, সস এসব তো ছিলোই।

 

৩.চিকেন গ্রিল

চিকেন গ্রিল; Source: লেখিকা

 

চিকেন গ্রিল দেখতে খুবই চমৎকার ছিল। গ্রিলের সাইজও যথেষ্ট বড় ছিল। গ্রিলের সাথে দেয়া সসও ভালো ছিল। সস আর চাটনি মিশিয়ে যখন একটু মাংস মুখে দিলাম, অসাধারণ লেগেছিল এর স্বাদ।

গ্রিলের মাংসের ভেতরেও মশলা ভালোভাবে মিশেছে। সেদ্ধও হয়েছে পরিপূর্ণভাবে। চাপের চেয়ে গ্রিল-ই বেশি ভালো লেগেছিল আমার।

 

৪. মাটন হালিম

মাটন হালিম; Source:foodies gossip (Comilla)

 

হালিমের রংটা বেশি সুন্দর ছিল। দর্শনদারীতে ভালো লাগলেও হালিমের স্বাদটা খুব একটা ভালো লাগেনি। কেমন যেন একটা গন্ধ পাচ্ছিলাম হালিম থেকে। হালিমের ঘনত্বও পাতলা ছিল।

তবে হালিমে মাংসের পরিমাণ মোটামুটি বেশিই বলা যায়। হালিমের পরিমাণও যথেষ্ট ভালো ছিল।

 

৫. নান

নান; Source: লেখিকা

 

সচরাচর যেমন হয় খেতে, নান তেমন-ই ছিল। কোনো বিশেষত্ব খুঁজে পাইনি। স্বাদ নরমাল ছিল।

৬. বোরহানি

বোরহানি; Source: লেখিকা

 

বোরহানির স্বাদ ভালো ছিল। দই, মশলা, কাঁচা মরিচ, পুদিনা পাতা ইত্যাদি সব উপকরণ পরিমাণমতোই ছিল। বোরহানির ঘনত্ব ও স্বাদ সন্তোষজনক।

 

অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা

দাওয়াত রেস্টুরেন্টের ভেতরের জায়গাটি বেশ বড়। পরিবার নিয়ে একসাথে বসে খেতে চাইলে আপনি আরাম আয়েশেই খেতে পারবেন।

রেস্টুরেন্টের ভেতরের দৃশ্য; Source: লেখিকা

 

ভেতরে আলো বাতাসের পর্যাপ্ত ব্যাবস্থা রয়েছে। ভেতরের চেয়ারগুলো বেশ নজরকাড়া। সবচেয়ে ভালো লেগেছে যে বিষয়টি তা হলো- প্রতিটি টেবিলের জন্য ছিল আলাদা আলাদা ওয়েটার।

 

বাহ্যিক সাজসজ্জা

কুমিল্লার একমাত্র রেস্টুরেন্ট যেখানে পুরোপুরি খোলা আকাশের নিচে বসে খাওয়া যায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে আপনি যখন মুরগির চাপ বা গ্রিলে কামড় বসাবেন তখন বোধয় খাবারের টেস্ট আরো কয়েকগুণ এমনিতেই বেড়ে যায়।

বাইরেও বসার জায়গা পর্যাপ্ত। জায়গাটিও বেশ বড়। বাইরের প্রতিটি টেবিলের জন্যেও রয়েছে একজন ওয়েটার। এদিকেও আলো বাতাসের যথাযথ ব্যাবস্থা রয়েছে।

রেস্টুরেন্টের বাইরের বসার জায়গা; Source: লেখিকা

 

তবে খোলা আকাশ আর প্রাকৃতিক বাতাসের কারণে আমার বাইরের জায়গাটিই বেশি ভালো লেগেছে।

 

পরিবেশ

দাওয়াত রেস্টুরেন্টের পরিবেশ বাকি ৮-১০ টা রেস্টুরেন্টের মতো নিরিবিলি না। রাস্তার পাশে হওয়াতে আর রেস্টুরেন্টের ঠিক দুই পাশে দুইটি হাসপাতাল থাকায়, প্রচুর মানুষের ভিড় থাকে চারপাশে।

ভেতরে শিক কাবাব ও নান বানানো হচ্ছে; Source: লেখিকা

 

মানুষের ভিড় থাকার কারণে চারপাশের শব্দও খানিকটা বেশি। তবে ভেতরের পরিবেশ নিয়ে বলতে গেলে বলবো, আপনি এখানে শব্দটা কম পাবেন। তবে গরম বাইরের তুলনায় একটু বেশি লাগবে।

ভেতরে যদিও ফ্যানের ব্যাবস্থা রয়েছে তবে একটু গরম বেশিই। ভেতরে দেয়ালগুলোতে বিভিন্ন ছবির ফ্রেম সাজানো রয়েছে। সব মিলিয়ে, ভেতরের পরিবেশ খুব পরিষ্কার। আপনি চাইলেই, পরিবার-পরিজন, বন্ধুদের নিয়ে একসাথে বসে দাওয়াত রেস্টুরেন্টে পেট পূজো করতে পারবেন।

 

সার্ভিস

দাওয়াত রেস্টুরেন্টের সার্ভিস নিয়ে আমি কিছুটা হতাশ। এদের ওয়েটারদের যেন কাস্টমারদের প্রতি খুব একটা খেয়াল নাই। যদিও প্রতিটি টেবিলের জন্য একজন করে ওয়েটার কিন্তু তাদেরকে প্রয়োজনের সময় খুঁজে পাওয়া যায় না।

ডাকার পর কিছু আনতে বললে, কতক্ষণ পর দেখবেন আপনার প্লেটের খাবার শেষ, কিন্তু ওয়েটার মহোদয়ের এখনো আসার নাম নেই। বিল দেওয়ার সময়ও আপনি ওয়েটার বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পাবেন না।

রিসিট ছাড়াই মুখে এসে বিলের পরিমাণ বলে দেবে। রিসিট দিতে বললে বলবে- রিসিটের প্রয়োজন নেই। তাই সার্ভিস নিয়ে রেটিং করলে আমি ৪/১০ দেব।

 

দাম

বিফ বিরিয়ানি- ১৭০ টাকা
চিকেন চাপ- ১০০ টাকা
চিকেন গ্রিল (কোয়ার্টার)- ৯০ টাকা
বাটার নান- ২০ টাকা
মাটন হালিম (বাটি)- ৬০ টাকা
বোরহানি প্রতি গ্লাস- ৩০ টাকা

মেন্যু কার্ড; Source: লেখিকা

 

রেটিং

বিফ বিরিয়ানি- ৭.৫/১০
চিকেন চাপ- ৭/১০
চিকেন গ্রিল- ৮.৫/১০
মাটন হালিম- ৭/১০
বাটার নান- ৭.৫/১০
বোরহানি- ৮.৫/১০

লোকেশন

ঝাউতলা কুমিল্লা (মুন হাসপাতালের পাশে)। শহরের যে কোনো জায়গা থেকে রিকশা দিয়ে ঝাউতলা, মুন হাসপাতালের কাছে আসলেই পেয়ে যাবেন দাওয়াত রেস্টুরেন্ট।

 

Feature Image: Joyana

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here