কুমিল্লার ‘পিজ্জা ডট’এ একদিন…

প্রচণ্ড গরম, ভার্সিটির ক্লাস শেষে টমছমব্রিজে যখন সিএনজি থেকে নামলাম তখন মেজাজ ভীষণ খারাপ। এই খিটখিটে মেজাজ নিয়ে আর বাসায় যেতে ইচ্ছে করছিলো না। আবার সকালে না খেয়ে যাওয়ায় পেট বাবাজীর মধ্যে ইদুঁর দৌড়াচ্ছিল ক্রমাগত! ভাবলাম, কিছু খেয়েই যাই।

রেস্টুরেন্টের বাইরের দৃশ্য; Source: Pizza Dot

মেডিকেল কলেজ রোডে রয়েছে কাঙ্ক্ষিত ‘পিজ্জা ডট’। কাঙ্ক্ষিত বলার কারণ, অনেকদিন ধরেই যাবো যাবো করেও যাওয়া হচ্ছিলো না। একে তো বাসা থেকে অনেকটাই দূরে, আবার দাম ও আকাশছোঁয়া।

তারপরও যেহেতু নিজে স্বঘোষিত খাদক, তাই শহরের আনাচে-কানাচে সবজায়গায় খেয়ে, চেটেপুটে দেখতেই হয়। একে তো আমি ফাস্ট ফুডপ্রেমী। তার উপর ‘পিজ্জা’ শব্দটা মনে হতেই মাথার মধ্যে কুড়কুড় করছিলো।

তো যেই ভাবা, সেই কাজ। ওদিকে দাঁড়িয়েই বান্ধবীকে ফোন দিলাম। বললাম, “কিছু খেতে ইচ্ছে করছে, কি খাবো বল? ‘পিজ্জা ডট’এ যাবো নাকি? আসবি তুই?” বান্ধবীও রাজি হয়ে বললো, দাঁড়াতে। সে আসছে।

প্রচণ্ড গরমে দাঁড়িয়ে থাকতেও ক্লান্তি লাগছিলো না, কারণ যাবো তো পিজ্জা খেতে! পিজ্জা নিয়ে সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে যেন পিজ্জার জগতে হারিয়ে যাচ্ছিলাম। সেই হারিয়ে যাওয়া থেকে মিনিট দশেক পর বান্ধবী এসে আমাকে উদ্ধার করলো। অটো নিয়ে ১৫ মিনিট পর পৌঁছে গেলাম ‘পিজ্জা ডট’এ।

রেস্টুরেন্টের ভেতরের দৃশ্য; Source: Pizza Dot

বাইরের দরজা দিয়ে ঢুকতেই থমকে গেলাম। ওরেহ বাপ! ইন্টেরিয়র তো চমৎকার! সাদা-কালো- নীলের মিশেলে, হরেক রকমের লাইটিং, কাঠের কারুকার্যের অসাধারণ ছোঁয়ায় যেন মন ভালো হয়ে গেল। সাথে এয়ার কন্ডিশনারের শীতল স্পর্শ যেন ভালোলাগা আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল। সুন্দর দেখে একটা টেবিল বেছে বসে পড়লাম দু’জনে সেদিকে।

ওমা! বসে দেখি, পাশে একটা ভেসপাও আছে। তার পাশের দেয়ালে দেখতে পেলাম ‘কুমিল্লা’ নিয়ে অনেক কিছু লেখা। ‘কুমিল্লা’ নামটি কোথা থেকে এসেছে, এর ঐতিহ্য কী, সবকিছু নিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা সেদিক থেকে পাওয়াই যায়। এদিকটায় আবার ফ্রেন্ড সার্কেল কিংবা পরিবার নিয়ে বাসায় বসার মতো ফ্লোরে গদি বিছানো আছে। যেকেউ চাইলে সেদিকেও আরামে বসে পিজ্জা খেতে পারবে।

রেস্টুরেন্টের ভেতরের ভেসপা; Source: লেখিকা

তার অপর পাশে খুব সুন্দর করে সাজানো রয়েছে ফ্রেমে বাঁধা পিজ্জার কিছু ছবি, তার পাশেই চোখে পড়ল পিজ্জা নিয়ে সুন্দর সুন্দর লাইন। ‘পিজ্জা ডটে’র থিম ”Eat, Laugh and Share” লাইনটিও সুন্দর ফন্টে লেখা।

ভেতরের ওয়াল পেইন্টিং; Source: লেখিকা

এসব দেখতে দেখতে টেবিলের ওপর থাকা মেন্যু কার্ডে চোখ পড়লো। মেন্যু কার্ডটিও সাধারণ রেস্টুরেন্টের মতো একটা নরমাল কার্ড নয়। খুব সুন্দর করে সাজানো একটি মেন্যু কার্ড, যেটি আবার চারপাশে সুন্দর একটি ফ্রেমে বাঁধানো। মোটকথা, রেস্টুরেন্টের মালিকের রুচিবোধের যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় ‘পিজ্জা ডট’এ গেলে।

মেন্যু কার্ড; Source: Pizza Dot

মেন্যু দেখে তাদের নতুন আইটেম ‘ফলিগনো’ অর্ডার করলাম। খাবার আসতে আসতে দুই বান্ধবী মিলে তাদের রেস্টুরেন্টের কিছু ছবি তুলে নিলাম, নিজেদেরও কিছু ছবি নিলাম। তার মাঝে ওয়েটার এসে প্লেট, চামচ, ছুরি, টিস্যু ইত্যাদি প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে গেল। অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন খাবার দেবে!

অপেক্ষার সময় যেন আর শেষ হয় না। প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর এলো সেই ‘ফলিগনো’।

ফলিগনো; Source: লেখিকা

প্রথম দেখাতেই যেন হামলে পড়বো দু’জনে! গুণে যেমনই হোক, দর্শনধারীতে ‘ফলিগনো’ মোটমাট ভালো মার্কিং পেয়েই পাশ করে গেল। তবে সাইজ দেখে একটু হতাশ ই হয়েছি। কারণ এতোটুকুনে কি আর পেট ভরবে!

ওয়েটার আবার জিজ্ঞেস করলো, আর কিছু লাগবে কিনা! আমরা কোল্ড ড্রিঙ্কস দিতে বলে খাবার শুরু করলাম।

না বাবা! ‘ফলিগনো’ যেমন দর্শনধারীতেও ঠিক ছিলো, এবার স্বাদেও পাশ করে গেলো ভালোভাবেই। সসেজ, চিকেন, চিজ, টমোটো সস, ক্যাপসিকাম সবকিছুর কম্বিনেশনে একটা অসাধারণ খাবার ছিল এই ‘ফলিগনো’।

মুখে দিতেই যেন সব উপাদানগুলো একসাথে মিশে কেমন একটা টক-ঝাল-মিষ্টি টাইপ স্বাদ মুখে লাগলো। এ স্বাদই আবার খাবারটিতে কামড় বসাতে ইচ্ছে জোগালো। কামড়ে কামড়ে সসেজ আর চিকেনের সমারোহ যেন ‘ফলিগনো’র টেস্ট কে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলো।

বসার জায়গা; Source: Pizza Dot

আপনি যদি বেশি ঝাল খেতে চান সেক্ষেত্রেও সমস্যা নেই। টেবিলের উপর শুকনো মরিচ গুঁড়া রাখা আছে, আপনি চাইলে মরিচ গুঁড়া মিশিয়ে ঝাল বাড়িয়েও খেতে পারবেন।

অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা

‘পিজ্জা ডটে’র অভ্যন্তরীণ ডিজাইন দেখে কেউ হতাশ হবে বলে মনে করি না। অসাধারণ ছিমছাম সুন্দর পরিবেশ। সববয়সের মানুষই এখানে কমফোর্টেবল হয়ে খেতে পারবে। ভেতরের আলোকসজ্জা চোখে পড়ার মতোন সুন্দর।

রেস্টুরেন্টের ভেতরের দৃশ্য; Source: Pizza Dot

ওয়াল পেইনটিং, ফ্রেমে বাঁধানো ছবি সবগুলোতেই আভিজাত্যের ছোঁয়া স্পষ্ট। একপাশে বসার জন্য রয়েছে গাড়ির টায়ারের সদৃশ মোড়া জাতীয় আসন। যেটা দেখতেও খুব অসাধারণ ছিল। এদের পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতাও চোখে পড়ার মতোই। সার্ভিস ও সন্তোষজনক ছিল।

পরিবেশ

রেস্টুরেন্টের ভেতরের দৃশ্য; Source: Pizza Dot

‘পিজ্জা ডট’এর পরিবেশ সন্তোষজনক। মানুষ আসছে যাচ্ছে কিন্তু তেমন কোন উচ্চবাচ্য নেই, কোলাহল নেই। ভেতরের আলো বাতাসের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত । শীততাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল। লাইটিং ও সন্তোষজনক।

মোটকথা, আপনি ‘পিজ্জা ডট’এ বসে হতাশ হবেন না। মন ভালো করা পরিবেশ এখানে।
একটু পরপর ওয়েটারের এসে জিজ্ঞেস করা “আর কিছু লাগবে কি না, কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা” এসব যেন ‘পিজ্জা ডট’এর প্রতি একধরনের ভালোলাগাই সৃষ্টি করে। তাঁদের সকলের আচার-আচরণ, ব্যবহার বেশ ভালো। সকল বয়সের মানুষের ক্ষুধার্ত পাকস্থলী ও হৃদয়ের জন্য ‘পিজ্জা ডট’ একটি আনন্দমঠ।

স্বাদ

আমাদের দু’জনেরই খুব ভালো লেগেছিল ‘ফলিগনো’। তবে দাম বিবেচনায় রেটিং করতে হলে তা হবে ৮/১০।

দাম

‘ফলিগনো’টির দাম ছিল ২৯০ টাকা। কোকাকোলার দাম ছিল ২০ টাকা করে। আমাদের মোট খরচ হয়েছিল ৩১০ টাকা।

লোকেশন

৪৬০/২, নার্গিস টাওয়ার, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ রোড, কুমিল্লা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here