চট্টগ্রামের বিখ্যাত “মেজ্জান হাইলে আইয়ুন”এর মেজবানি খাবার

চট্টগ্রাম শহরটার জন্য আমার কেমন যেন একটা মায়া কাজ করে। যদিও ওই শহরে আমার কিছুই নেই, তবুও শহরটা খুব পছন্দের। ঘোরাঘুরির জন্য তো চট্টগ্রামের জুড়ি নেই, তেমনই খাবারের জন্যও। বিশেষ বিশেষ নানা খাবারে স্বয়ংসম্পূর্ণ চট্টগ্রাম বিভাগ। চট্টগ্রামের খাদ্য জগতে বিখ্যাত নাম হলো “মেজবানি খাবার।”

মেজবান একটি ফারসি শব্দ। এর অর্থ হলো নিমন্ত্রণকর্তা। চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ‘মেজ্জান।’ সাধারণত কারো মৃত্যুর পর কুলখানি, চেহলাম, মৃত্যুবার্ষিকী, আকিকা উপলক্ষে, ধর্মীয় ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকীতে মেজবানের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের শুভ উপলক্ষ্যেও মেজবানের আয়োজন করা হয়।

মেজবানি ভালোবাসা; Source: লেখিকা

এসব অনুষ্ঠান ছাড়াও চট্টগ্রাম শহরে গেলে মেজবান খেতে পারবেন একটি রেস্টুরেন্টে। যার নাম “মেজ্জান হাইলে আইয়ুন।” এছাড়াও আরো নানা রেস্টুরেন্টে মেজবানি খাবার পাওয়া গেলেও, এটিই সবচেয়ে বিখ্যাত। এমনকি ঢাকায়ও মেজবানি খাবারের দোকান চালু করা হয়েছে। কিন্তু মেজ্জান হাইলে আইয়ুন শুধু চট্টগ্রামে নয়, সারা বাংলাদেশেই এক পরিচিত নাম।

সীতাকুণ্ডের মহামায়া লেক আর গুলিয়াখালি সি বিচ ঘুরে সীতাকুণ্ড বাজার থেকে যখন ঢাকায় ফেরার বাসে উঠবো, তখন আমাদের মনে হলো মেজবান না খেয়ে ফেরা উচিত না। চট্টগ্রাম শহর আর বেশি দূরেও নেই। ভাবতে সময় লাগলেও রওনা দিতে দেরি হলো না। পুরো টিম মিলে রওনা হয়ে গেলাম ঢাকার ঠিক উল্টোপথ চট্টগ্রামে।

মেজবানি খানা; Source: লেখিকা

সীতাকুণ্ড থেকে হাইওয়ের ছোট বাস ধরে চলে গেলাম এ.কে খান মোড়। সেখানে ইউনিকের ফিরতি টিকেট কেটে সিএনজি নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম মেজবান হাইলে আইয়ুনের জামালখান শাখায়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন ঢুকেছি, আমি তখন অর্ধেক ঘুমে। সেভাবেই মেন্যু দেখতে থাকলাম। এটাই আমার মেজ্জান হাইলে আইয়ুনে প্রথমবার যাওয়া।

মেন্যু দেখে তাদের “স্পেশাল টেইক এওয়ে ফ্যাকেজ” এর দুটো সেটই অর্ডার করি। ফ্যাকেজ শব্দটা দেখে ঘাবড়ে যাবেন না। তাদের সব শব্দই এভাবে লেখা। যেমন- হাইলে, হালা ভুনা, ডাইল, ফরটা ইত্যাদি। আঞ্চলিক খাবারের ঐতিহ্যের সাথে আঞ্চলিক ভাষার ঐতিহ্য ধরে রাখতেও যেন বদ্ধপরিকর। একটি আধুনিক সাজসজ্জার রেস্টুরেন্টে পুরোপুরি আঞ্চলিক ভাষায় লেখা দেখতেও অন্যরকম ভালো লাগে।

সাদা ভাত; Source: লেখিকা

খাবার অর্ডার করে রেস্টুরেন্টের দেয়ালে লাগানো ছবিগুলো দেখতে থাকলাম। মেজবান রান্নার বিভিন্ন ছবিই সেখানে টানানো। আর দেয়াল জুড়ে আঞ্চলিক ভাষায় লেখা নানা খাবারের নাম। ঐতিহ্য ধরে রাখার এই প্রচেষ্টা মেজ্জান হাইলে আইয়ুনের বিশেষত্ব। খাবারের টেবিলগুলোতেও একইভাবে খাবারের নাম লেখা।

খাবার দিতে একদমই দেরি করেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাত ভর্তি মাটির সানকি দিয়ে যায়। রেস্টুরেন্টটিতে এখানেও ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচেষ্টা। মাটির সানকিতে ভাত, মাটির বাটিতে তরকারি খেতে দেয়া হয় ক্রেতাদের। তাই রেস্টুরেন্টে বসে মেজবান খাচ্ছেন না ভেবে, চট্টগ্রামের কোথাও মেজবানি দাওয়াত খেতে গিয়েছেন ভাবতে অসুবিধে হবে না।

ছনার ডাইল; Source: লেখিকা

খাবারের মেন্যুতে ছিলো সাদা ভাত, ছনার ডাইল আর মেজ্জাইনে গোস্ত। ঝরঝরে সাদা ভাতের সাথে প্রথমেই নিলাম ছনার ডাইল। ছনার ডাইলটা হচ্ছে বুটের ডালের সাথে গরুর মাংস আর হাড়গোড় দিয়ে রান্না করা। বুটের ডাল দিয়ে গরুর মাংস বাসায় রান্না হয়েছে অসংখ্যবার। বাসার রান্না আর এই রান্নার তফাৎ অনেক। মেজবানিতে যেভাবে মশলা দিয়ে রান্না করা হয়, ওদের রান্নায় মশলা ব্যবহারের রীতি একই।

ছনার ডাইল শেষ করে নজর দিলাম মেজ্জাইন্নে গোস্তের দিকে। প্রচুর মশলা ও ঝোল দিয়ে রান্না করা হয় মাংসটা। খেতে গিয়ে আমার অনেকটা গ্রামের বিয়ে বাড়ির মাংসের স্বাদের কথা মনে পড়েছিলো। যদিও দুটো রান্নার উপায় পুরোপুরি আলাদা। মেজবান রান্নার আলাদা একটা ঘ্রাণ থাকে। এই ঘ্রাণটাই যেকোনো অনুষ্ঠানের রান্নার থেকে মেজবানকে আলাদা করবে।

মেজ্জাইন্নে গোস্ত; Source: লেখিকা

খাওয়া শেষ করে বসে ডেজার্ট আইটেমের দিকে নজর দিলাম। প্রথমেই পছন্দ হলো ফিন্নি। তবে কপাল খারাপ হওয়ায় ফিন্নি মাত্র দুটো ছিলো। উপায় না পেয়ে দুটো নিয়েই সবাই ভাগাভাগি করে খেলাম। আমার কাছে ফিন্নিটা সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে। ফিন্নিতে মিষ্টির পরিমাণ ছিলো খুবই কম। অতিরিক্ত চিনি দেয়া ফিন্নি খেতে আমার বিরক্ত লাগে।

শেষ হয়েও হলো না শেষের মতো এরপর মনে হলো বোরহানিটা চেখে দেখাই যাক। বোরহানিতে চুমুক দিয়েও আমি খুশি। বোরহানি আমি সাধারণত পান করি না এর ঘ্রাণের জন্য। মেজ্জান হাইলে আইয়ুনের বোরহানিটা ওই বোরহানি সুলভ ঘ্রাণটা কম ছিলো। সব মিলিয়ে বেশ ভালো লেগেছিলো। এই হলো শুধু মেজবানি খাবার খেতে চট্টগ্রাম যাওয়ার গল্প। এরপর ফেরার পালা।

ফিন্নি; Source: লেখিকা

রেটিং

ছনার ডাইল- ৭/১০

মেজ্জাইন্নে গোস্ত- ৮/১০

ফিন্নি- ৯/১০

বোরহানি- ৮/১০

মূল্য

১ কেজি মাংসের আর ১ কেজি ছনার ডালের প্যাকেজের দাম ছিলো ১১৬০ টাকা। ১/২ কেজি মাংস আর ১/২ কেজি ছনার ডালের প্যাকেজের দাম ছিলো ৬৩০ টাকা। গরুর মাংসের এই চড়া বাজারে দাম কমই বলা যায়। ড্রিঙ্কস, ফিন্নি, বোরহানি মিলিয়ে বিল এসেছিলো ১৮০০+ টাকা।

মূল্য তালিকা; Source: লেখিকা

পরিবেশ

লেখাটায় আমি বেশ কয়েকবার মেজ্জান হাইলে আইয়ুনের ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছি। রেস্টুরেন্টের পরিবেশের কথা বলতে গেলে এটাই ঘুরে ফিরে বলতে হয়। চমৎকার নান্দনিকতা পুরো রেস্টুরেন্ট জুড়ে। বসার জায়গাগুলোও বেশ সুন্দর। আরাম আয়েশ করে খেতে একদমই সমস্যা হবে না। আর চারদিকের মেজবানের নানান ছবি আর খাবারের নাম দেখতে দেখতে সব খাবার চেখে দেখার ইচ্ছে তো জাগবেই। রেস্টুরেন্টটির প্রতিটা স্টাফের ব্যবহারও অনেক ভালো।

লোকেশান

জামালখান: জামালখানে চট্টগ্রাম আইডিয়াল স্কুলের বিপরীতে (বারকোড ক্যাফে)

চকবাজার: চকবাজারের গুলজার টাওয়ার থেকে হাতের বামে ৫ মিনিট হাঁটলেই মেজ্জান হাইলে আইয়ুন (চট্টগ্রাম মেডিকেলের পেছনে)।

 

Featured Image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here