চিরচেনা সিরাজগঞ্জ শহরে প্রিয় খাবারের খোঁজে

ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি বেলকুচিতে এসেছি দুই মাসের বেশি হয়ে গেছে। বেলকুচি হচ্ছে সিরাজগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা। অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম সিরাজগঞ্জ শহরে যাবো। ছোটবেলা থেকে সিরাজগঞ্জ শহরে থেকে পড়াশোনা করেছি, সেখানেই বড় হয়েছি। তাই আমার সব বন্ধুবান্ধব সেখানেই। অনেকদিন হলো বন্ধুদের সাথে দেখা হয় না। তাই ভাবছিলাম, একদিন সিরাজগঞ্জ থেকে ঘুরে আসতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততার কারণে সময়ই পাচ্ছিলাম না। এদিকে ঈদের কিছু কেনাকাটার প্রয়োজন ছিল, তাই শহরে একবার যাওয়াটা বেশ জরুরী ছিল।

অবশেষে ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে রওনা হলাম সিরাজগঞ্জের উদ্দেশে। সিরাজগঞ্জ আসার উদ্দেশ্য ছিল তিনটা। প্রথমত ঈদের কিছু কেনাকাটা, দ্বিতীয়ত বন্ধুদের সাথে দেখা করা এবং প্রিয় সিরাজগঞ্জ শহরের কিছু পুরনো খাবারের নতুন করে স্বাদ নেওয়া।

সিরাজগঞ্জ শহরের বিখ্যাত বড়পুল (ইলিয়ট ব্রিজ); ছবিসূত্র: bd.geoview.info

প্রথমে কেনাকাটা শেষ করলাম। বাড়ি থেকে দুপুরের পর বের হয়েছিলাম, তাই কেনাকাটা শেষ করতে করতে প্রায় ছয়টা বেজে গেল। কেনাকাটা শেষ করে বন্ধুদের সাথে দেখা করার জন্য এসএস রোড থেকে রিক্সা নিয়ে বাহিরগোলা পাওয়ার হাউস কলোনিতে গেলাম। এই কলোনিতেই ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছি। সেখানেই বন্ধুদের সাথে দেখা করলাম। সবার সাথে গল্প করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আমাকেও বাড়ি ফিরতে হবে। বন্ধুদের কয়েকজন বাসায় চলে গেল।

আমি, আমার দুই বন্ধু মাসুম এবং দীপ্ত একসাথে থেকে গেলাম। সিরাজগঞ্জে থাকাকালীন বেশ কয়েকটি খাবার নিয়ম করে বন্ধুদের সাথে খেতাম। বড়পুলের চা, চৌরাস্তার পুরি সিঙ্গারা, বড়বাজারের কাটলেট, তৃপ্তি হোটেল আর বসুন্ধরা হোটেলের মোগলাই এবং এসএস রোডের বড়বাজার পার হয়ে জনতা বস্ত্রালয়ের সামনের শিক কাবাব আর নান রুটি বেশ প্রিয় ছিল আমাদের কাছে।

শিক কাবাব আর নানরুটির বিখ্যাত সেই দোকান; ছবিসূত্র: লেখক

এরমধ্যে শিক কাবাব আর নান আমার কাছে বেশি ভালো লাগতো। সিরাজগঞ্জ শহরের কিছু কিছু খাবারের স্বাদ অন্য কোথাও পাই না। যখন কেনাকাটা করছিলাম তখনই ভাবলাম, আজকে শিক কাবাব আর নান রুটি খাবো। কিন্তু সেই শিক কাবাব আর নানরুটির দোকান যেখানে বসতো, সেখানে সেই দোকান দেখতে পেলাম না।

এদিকে আমরা তিনজন বড়পুলের (ইলিয়ট ব্রিজ) দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। পথে মাসুমের কাছে জানতে চাইলাম, সেই শিক কাবাব আর নান রুটির দোকানের কথা। পরে মাসুম জানালো, সেই দোকান অন্য এক জায়গায় বসে। পরে আমি বললাম, তাহলে সেখানেই চল।

ছবিসূত্র: লেখক

পরে তিনজন বড়পুলের মাথা থেকে এসএস রোডের দিকে গেলাম। এসএস রোডে আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয়ের সামনেই সেই শিক কাবাবের দোকান বসে এখন। দোকানের সামনে গিয়ে প্রথমে শিকে করে কয়লায় কাবাব তৈরির কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম।

দোকানটা খুবই ছোট। দোকান বলতে একটা ভ্যানগাড়ি। এটা কোনো রেস্টুরেন্টও নয়, এটা সিরাজগঞ্জ শহরের জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড। আমাদের তিনজনের জন্য দুইটা করে নান আর দুইটা করে শিক অর্ডার করে দোকানের পাশে ফুটপাতে রাখা চেয়ারে বসলাম। বসার পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাদের কাবাব আর নান ছোট প্লেটে করে দেওয়া হলো। আমি আবার কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম।

শিক কাবাব আর নান ঝলসানো হচ্ছে; ছবিসূত্র: লেখক

তারপর খেতে শুরু করলাম। খেতে খেতে দোকানের কর্মচারীর কাছে থেকে জেনে নিলাম নান আর কাবাব তারা কীভাবে বানায়। সে জানালো, রাতে ময়দা, ডিম, দুধ, কলা, চিনি, তেল দিয়ে খামির বানিয়ে রাখা হয়। তারপর সকালে খামিরের সাথে কাবাবের জন্য গরুর যে মাংস তারা ব্যবহার করেন, সেটার তেল মাখিয়ে নেন।

পরে ছোট গোল রুটির মতো করে নান তৈরি করে নিয়ে বাসা থেকে। দোকানে এনে অর্ডার পাওয়ার পর গরম করে পরিবেশন করেন। আর কাবাব তৈরির জন্য তারা গরুর মাংস পাতলা করে কেটে বিভিন্ন মসলা যোগ করে বাসায় কিছুটা রান্না করে নিয়ে আসেন। পরে কয়লার তাপে ঝলসে বিক্রি করা হয়।

খাবারের মান এবং স্বাদ

সিরাজগঞ্জ শহরের যেকয়টি স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবারের দোকান শহরের প্রাণকেন্দ্র এসএস রোড এবং মুজিব সড়কে দেখা যায়, তার মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে এই শিক কাবাব আর নান রুটি। খাবার হিসেবে খুবই সুস্বাদু এবং মজাদার। নান রুটিটা ঢাকার নান রুটির মতো নয়। এটা সাধারণ পাতলা রুটির মতো, তার সাথে গরুর তেল যোগ করে ভাজা হয়েছে।

শিক কাবাব আর সেই নান; ছবিসূত্র: লেখক

তাই যারা ডায়েট করছেন তাদের জন্য রুটিটা খাওয়ার উপযোগী না, কারণ অনেক বেশি তেল ব্যবহার করা হয়েছে। তবে মসলাদার নান রুটিটা দেখে লোভ সামলানো কঠিন। আর কাবাবও সেই আগের মতোই আছে। বেশ ভালোভাবে ঝলসানো, একটু ঝাল ঝাল ছিল এবং মসলার কম্বিনেশনটা দারুণ ছিল। কাবাবের মাংস ভালোভাবে সেদ্ধ হয়েছিল এবং ভিতরে মসলাগুলো ভালোভাবে প্রবেশ করায় খেতে দারুণ লাগছে। খেতে সুস্বাদু হওয়ায় আরো দুইটা করে নান আর দুইটা করে শিক নিলাম।

পরিবেশন

যেহেতু রাস্তার পাশে সাধারণ মানের একটি দোকান, তাই এখানে পরিবেশনটাও অতি সাধারণ। দোকানদার মূলত তার খাবারের স্বাদের দিকে বেশি নজর দিয়েছেন। রাস্তার পাশে ভ্যানে করে যেহেতু বিক্রি করেন তাই যারা খেতে আসেন তাদের অধিকাংশ দোকানের চারপাশে দাঁড়িয়ে প্লেট হাতে নিয়ে খান।

অসাধারণ এক খাবারের অতি সাধারণ পরিবেশন; ছবিসূত্র: লেখক

তবে বসার জন্য পাঁচ থেকে ছয়টা চেয়ার আছে। ছোট একটা প্লেটে পেপারের টুকরার উপর কিছু পেঁয়াজ কুচির সাথে নান আর শিক কাবাব পরিবেশন করা হয় । যদিও পেপারের উপরে কোনো খাবার নিয়ে খাওয়া ঠিক না। তবে রাস্তার পাশের ছোট দোকানগুলোতে এসব মানা হয় না দেশের কোথাও।

দরদাম

খাবারের স্বাদের সাথে দামের তুলনা করলে বেশ সস্তাই বলা যায়। প্রতিটি নানের দাম মাত্র ১০ টাকা এবং প্রতি শিকের দামও ১০ টাকা। তবে যেহেতু ১০ টাকার শিক কাবাব, তাই এটা ছোটই হয়ে থাকে। নানটাও খুবই ছোট।

অবস্থান

সিরাজগঞ্জ শহরের এসএস রোডে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে প্রতিদিন বিকালে এই শিক কাবাব আর নানের দোকান বসে।

 

ফিচার ইমেজ: লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here