টং ঘরের নান্দনিকতা ও চকোলেট বাদাম চায়ের ইতিবৃত্ত

নগরীর বুকে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলার স্থান নেই বললেই চলে। যানজটের থাবায় জীবন যেন মুষড়ে পড়ে। ধোঁয়া ওঠা চা, খোলা আকাশে পাখির মতো ডানা মেলে ছুটে চলা, গ্রামের সবুজ ঘাসে খালি পায়ে হেঁটে চলার দৃশ্য শহরে নেই বললেই চলে।

শহরের শরৎগুলো যেন শরৎ হয় না, ভাদ্র মাসের চাঁদের মোহনীয় রূপ দুচোখ ভরে উপভোগ করার সুযোগ ও পরিবেশ কোনোটাই মেলে না। শরতের এই বেলায় বেশ কয়েকদিন থেকে আমার কাশফুলের সান্নিধ্য পেতে ইচ্ছে করছে। কাজের চাপ ও নানা ব্যস্ততার কারণে যাওয়া হয়নি।

ঢাকা উদ্যান নদীর ঐপাড়ে সিল্ক সিটি নামের একটি প্লট আছে। শুনেছি সেখানে কাশফুল ফুটেছে। তাই একদিন আয়োজন করে চলে গেলাম। কিন্তু হায়, কাশফুলের সান্নিধ্য পাওয়া হলো না। দিনটি ছিলি বৃষ্টিস্নাত দিন। নদীর ওপাড়ে লোকজন নেই বললেই চলে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝে নৌকা দিয়ে ঐপাড়ে গিয়ে ফিরে আসার নিশ্চয়তা পাওয়া কঠিন। তাছাড়া জায়গাটা খুব নিস্তব্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছে। তাই আমার কাশফুল দেখা হলো না।

ঢাকা উদ্যান নদীর এই পাড় থেকে সোজা ঢাকা উদ্যান লেগুনা স্ট্যান্ডের একটু সামনে, অর্থাৎ নবোদয় হাউজিঙে জনপ্রিয় চা ঘর (টং ঘর) রয়েছে। তাই ভাবলাম টং ঘরে গিয়ে চা খেলে মন্দ হবে না। এর আগে অবশ্য আরেকটা রেস্টুরেন্টে ঢুকেছিলাম। তবে অতি সম্প্রতি রেস্টুরেন্টটি খুলেছে বলে খাওয়ার তেমন কোনো কিছুই ছিল না। তাই টং ঘরে গিয়ে বসলাম।

টং ঘরের লোগো; source: সংগ্রহ

টং ঘর মোহাম্মদপুর এলাকার মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। চায়ের শৈল্পিকতা কত প্রকার ও কী কী তার পরিচয় এখানে আসলে পাওয়া যায়। তাছাড়া চায়ের যে বিভিন্ন রকম প্রকারভেদ হতে পারে তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় এখানে এলে।

টং ঘর নবোদয় হাউজিঙে অবস্থিত। ঢাকা উদ্যান লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে মাত্র দুই মিনিটের দূরত্ব। আগে অনেকবার টং ঘরে গিয়েছি। তবে রিভিউ লেখা হয়নি। তাই আজ ভাবলাম নানারকম চায়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে রিভিউ লিখলে মন্দ হয় না। টং ঘরে নান্দনিকতার ছোঁয়া রয়েছে। কেননা এর অভ্যন্তরীণ সজ্জা, পরিবেশ, বসার স্থান, চা পরিবেশনের ব্যবস্থা ইত্যাদিতে বিশেষ নান্দনিকতা লক্ষ্য করা যায়।

টং ঘরের দেয়াল ও আলোর ব্যবহার; source: লেখক।

দেয়ালে দেয়ালে রয়েছে দারুণ কারুকাজ। টং ঘরের আকৃতি বিশাল নয়। তবে পুরোটা জায়গা জুড়ে সৌন্দর্যের দেখা মেলে। এক পাশের দেয়ালে অনেক কবি সাহিত্যিকের বিভিন্ন কথা লেখা। অন্যপাশের দেয়ালে নান্দনিক ছবি আঁকা। চা পান করতে খেতে অন্য জগতে ভেসে যাওয়ার মতো মনে হয়। এই পাশের দেয়ালে হলুদ ও কালো রঙের আঁকিবুঁকি বোঝা গেলেও আসলে তা নিছক আঁকিবুঁকি নয়। এখানে আঁকা রয়েছে দুজন কপোত কপোতীর রেল লাইনের পথ ধরে ছাতা হাতে হেঁটে যাওয়ার রোমান্টিক দৃশ্য।

দেয়ালের মনোরম দৃশ্য; source: লেখক।

টং ঘরের সামনে কোনো দরজা নেই। বাইরে থেকে একেবারে সবকিছু দেখা যায়। স্বচ্ছ কাঁচের ব্যবস্থা নেই। তবে বাইরে বারান্দার মতো খানিকটা জায়গা রয়েছে। সেখানে কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা থাকে। ভেতরে কয়েকটি কাঠের টুল পাতা রয়েছে। এগুলো দেখতে বেশ সুন্দর। এখানে রোজ অনেক ভিড় হয়।

বিভিন্ন প্রকার চায়ের মেন্যু; source: লেখক।

কারণ ৬০-১০০ প্রকারের চা পাওয়া যায় এখানে। দুধ চা, র চা, আদা- দুধ চা, কালোজিরা চা, পুদিনা চা, লেবু চা, পনির চা, হরলিক্স চা, চকোলেট চা, চকোলেট বাদাম চা, এনার্জি চা, নারকেল দুধ চা, ওরিও চা, মাসালা দুধ চা, কোল্ড কফি, মোকা কফি, ব্ল্যাক কফি, রেগুলার কফি, টক ঝাল মিষ্টি চা, মাল্টা চা, ম্যাঙ্গো চা, আনারকলি চা, অনন্ত জলিল চা, বাবু মশাই চা, রিমিক্স চা, রজনীকান্ত চা ইত্যাদি। বিচিত্র ধরনের চায়ের নাম পড়ে আমার ভীষণ হাসি পেয়েছে। এখানে সবাই মোটামোটি কয়েক রকমের চায়ের স্বাদ নিতে আসে।

আমি টং ঘরে গিয়ে চকোলেট বাদাম চা এর অর্ডার করলাম। চকোলেট বাদাম চা প্রতি কাপ ৩৫ টাকা। আমি দুই কাপ অর্ডার দিলাম সঙ্গে আমার এক বন্ধু ছিল বলে। অর্ডার দেয়ার পর আমরা অনেক গুলো ছবি তুলে নিলাম। এমন নান্দনিক স্থানে এসে ছবি না তুললে কী হয়! নিজেদের ছবি তোলা ছাড়াও টং ঘরের বেশ কয়েকটা ছবি তুলেছি। এখানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, আলোকসজ্জা সবকিছুই সুন্দর। সাদা আলোয় আলোকিত থাকে সবসময়। যেহেতু আমরা বিকেলে চা পান করতে গিয়েছি, সেহেতু রাতের পরিবেশ সম্পর্কে জানি না।

চকোলেট বাদাম চা; source: লেখক।

অর্ডার করার দশ বারো মিনিটের মধ্যে চা চলে এলো। আমরা তো ভীষণ উত্তেজনায় ছিলাম কখন চায়ে চুমুক দিবো তা নিয়ে। তারপর চুমুক দিতেই বুঝতে পারলাম এর স্বাদ। বেশ মজা। চকোলেট ও বাদামের মিশেলে এক দারুণ চা। আগে একবার চকোলেট বাদাম চা পান করেছি। তখন আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে।

তবে এইবার মনে হয়েছে, আগের তুলনায় স্বাদ খানিকটা কম। তার অবশ্য কারণ আছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, চায়ে কাঁচা বাদাম ব্লেন্ড করে দিয়েছে কিংবা বেটে দিয়েছে। কাঁচা বাদামের স্বাদ আমার ভালো লাগে না। টং ঘরের অন্যান্য চায়ের স্বাদও ভালো।

অভ্যন্তরীণ সজ্জা ও পরিবেশ

টং ঘরের অভ্যন্তরীণ সজ্জা বেশ রুচিশীল ও নান্দনিক। এখানে চা পান করতে গেলে যেকোনো মানুষের ভালো লাগবে। তাছাড়া বিভিন্ন রকমের চায়ের স্বাদ পাওয়া যায় একটি মাত্র টং ঘরে। এখানের পরিবেশ বেশ সুন্দর। তবে স্থান বেশি বড় নয়। জায়গা যদি আরো একটু বেশি হতো তাহলে অনেক মানুষ একসাথে চা পান করতে পারতো। যেহেতু এখানে অনেক মানুষের ভিড় হয় অনেকে বসার জায়গা পায় না, দাঁড়িয়ে চা পান করে।

মূল্য

এখানের প্রায় সব রকমের চায়ের স্বাদ বেশ আলাদা। একেক চায়ের মূল্য একেক রকম। চকোলেট বাদাম চায়ের মূল্য ৩৫ টাকা করে। দুটো চকোলেট বাদাম চায়ের মূল্য এসেছে ৭০ টাকা।

অবস্থান

টং ঘরের অবস্থান নবোদয় হাউজিঙে। ঢাকা উদ্যান লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে পূর্ব দিকে দুই মিনিট হাঁটলে টং ঘর পাওয়া যাবে।

 

Featured Image: লেখক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here