ডেমরার ‘মা বাবার দোয়া মিষ্টান্ন ভান্ডার এন্ড বিরিয়ানি হাউজ’ এর জনপ্রিয় দই

‘ডেমরা থানা’ ঢাকা জেলার মধ্যে পড়লেও, জায়গাটা একবারেই বাইরের দিকে। এখানকার বাসিন্দারা নাগরিক সকল সুবিধা পেলেও, গ্রামীণ পরিবেশ এদিকটায় এখনও বিরাজমান। সেজন্যেই মূলত অনেকেই ঢাকার যান্ত্রিকতা থেকে একটু দূরে থাকতে চলে আসেন এদিকে ঘুরতে।

জায়গাটা কাছে, সময়ও কম লাগে, খরচও কম আবার গ্রামীণ সেই পরিবেশটাও পাওয়া যায়। সারাদিনের জন্য ঘুরতে এলে খাওয়া তো হবেই। ভোজনরসিকদের তো আবার ঘুরতে বের হওয়ার উদ্দেশ্য থাকে দুটো, খাওয়া ও ঘোরা। তাই লিখছি ডেমরার দিকে ঘুরতে এলে যেখানকার দই অবশ্যই খেয়ে যাবেন, সেই দোকানের কথা।

হাঁড়িভর্তি দই; Source: লেখিকা

ডেমরা থানার একটা জায়গার নাম হচ্ছে ‘স্টাফ কোয়ার্টার। ‘ স্টাফ কোয়ার্টার ডেমরার একটা লোকবহুল অংশ। এখানে চাইনিজ বা ফাস্টফুড থেকে শুরু করে ভর্তা দিয়ে পেট ভরে ভাত সবই খেতে পারবেন। কিন্তু এগুলো খাওয়ার পর তো চাই ডেজার্ট। সেই ডেজার্ট হিসেবেই খেয়ে নিতে পারেন এখানকার খুব পুরাতন একটি দোকানের দই। দোকানটির নাম “মা বাবার দোয়া মিষ্টান্ন ভান্ডার এন্ড বিরিয়ানি হাউজ।”

মিষ্টান্ন ভান্ডারের মিষ্টির কথা না বলে শুধু দইয়ের কথা কেন বলছি? কারণ এদের বিশেষত্বই এই দই দিয়ে। শুধু দই নয়, মিষ্টিও মজাদার এখানকার। মিষ্টিও খাবেন। তবে দই আবশ্যক। আর সব খেয়ে পিপাসা পেলে দই দিয়েই তৈরি এক গ্লাস ঠাণ্ডা মাঠা। মাঠাটাও বেশ ভালো এই দোকানের। শুধু দই খেয়ে শেষ করে মাঠা মিস করবেনই বা কেন!

দোকানে বসেই যেভাবে খাবেন দই; Source: লেখিকা

দোকানটা একবারে ছোট। গুণে গুণে তিনটি টেবিল রয়েছে। একসাথে বড়জোড় ১৮-২০ জন বসতে পারবে। তাতেও ভিড় লেগে যাবে। পুরাতন দোকান, পুরাতনেরই মতোই রয়ে গেছে। সেভাবে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি এখানে তা বলবো না, দোকানের মালিক চাননি দোকানের সেই চিরচেনা আবহটা মুছে যাক। আশপাশ তো সবই বদলে গেছে। তবুও ‘মা বাবার দোয়া মিষ্টান্ন ভান্ডার’ আগের মতোই রয়ে গেছে।

এখানকার দই তৈরি করা হয় আশপাশের গ্রাম থেকে আনা খাঁটি গরুর দুধ থেকে। আবার গরুর খামারও অনেক এদিকে। তাই দই তৈরির দুধটা তাজাই থাকে। তারপর নিজেদের রেসিপি দিয়েই তারা সেই দই তৈরি করে। দই তৈরির রেসিপি যদিও মোটামুটি সবই একই। তবুও প্রত্যেকটা দোকানেরই কিছু সিক্রেট বা আলাদা বিশেষত্ব থাকে। সেটা কোনো দোকানিই আপনাকে বলে দেবে না। এখান থেকেও দই তৈরির ব্যাপারে কিছু বলেনি।

মা বাবার দোয়া মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্পেশাল দই; Source: লেখিকা

এখানে দই কেজি হিসেবে এবং খুচরো দুইভাবেই বিক্রি করা হয়। দুই বা তিনজন লোকসংখ্যা হলে প্লেট হিসেবেই দই দিতে বলতে পারেন। আবার তেমন দইপ্রেমী বা খাদক হলে হাঁড়িসহই নিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু লোকজন বেশি হলে হাঁড়ি নিয়ে ফেলবেন অবশ্যই। এক হাঁড়ি দইতে এক কেজি থাকে। আরেকটু বড় হাঁড়িও আছে, সেটার ওজন এক কেজির থেকে বেশি। আপনার পছন্দ অনুযায়ী যেকোনোটা নিলেই হবে।

দইয়ের রকমফের হয় বেশ কিছু। এখানের দইটা এতো ভারী হয়না। খুব মোটা সর পড়া দইও না এটা। ভারী দইটা বাদামী বাদামী হয়। আর এটা সাদাটে। এই দইয়ে বাদামী দইয়ের মতো বেশি মিষ্টি থাকে না। ওরকম দই অনেকেই অতিরিক্ত মিষ্টির কারণে খেতে পারবে না। এটায় তেমন সমস্যা নেই একবারেই। মূলত আমার এই কারণেই দইটা বেশি পছন্দের।

দই আর মাঠা; Source: লেখিকা

মিষ্টি খেতে চাইলে দইয়ের আগেই খেয়ে নিবেন। দই আর মিষ্টিও একসাথে খাওয়া যায়, ওটার স্বাদও আলাদা। এখানে সাদা চমচম থেকে শুরু করে সন্দেশ, প্রায় সবধরনের মিষ্টিই আছে। অর্ডার করে যেমন দু-একটা করে খেতে পারেন, সেভাবে কিনে কেজি দরে সাথে নিয়েও যেতে পারেন। মিষ্টিগুলোও গরুর খাঁটি দুধ দিয়েই বানানো, তাই সতেজ থাকে। দোকান ছোট হলেও বাসি, পঁচা জিনিস ধরিয়ে দেয় না তারা।

মা বাবার দোয়া মিষ্টান্ন ভান্ডারে বিকেলবেলায় সমুচা আর সিঙ্গারাও পাওয়া যায়। সিঙ্গারা আর সমুচার স্বাদ খুব আলাদা কিছু না। সাথে বিরিয়ানি আর তেহারিও পাওয়া যাবে দুপুর থেকে রাতে যেকোনো সময়। এমনিতে আর সব দোকানে যেমন হয়, তেমনই। তবে বিকেল ছাড়া অন্যসময় সিঙ্গারা পাওয়া যায় না। বিকেল থেকে সন্ধ্যায় যদি যান তবেই শুধু দেখা মিলবে সিঙ্গারা বা সমুচার। অন্যসময় হলে শুধুই দই, মিষ্টি আর মাঠা।

হরেকরকম মিষ্টি; Source: লেখিকা

দোকানের মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, দৈনিক গড়ে ৫০-৬০ হাঁড়ি দই বিক্রি হয়। খুচরো যত বিক্রি হয় তার থেকে বেশি বিক্রি হয় পাইকারি। বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন: বিয়ে, আকিকা, জন্মদিন এসবে আশপাশের সব এলাকার মানুষজন এখান থেকে অর্ডার দিয়ে দই নিয়ে যায়। সেজন্যই বিক্রি হয় অনেক। খুচরো বিক্রিও কম হয় না একবারে। এলাকার মানুষজন তো আছেই, বাইরে থেকে মানুষজন এলেও তাদের দোকানে দই খেতে ঢুঁ মেরে যান।

দই আর মিষ্টি তো দুটোই খাওয়া শেষ। বাকি রইলো মাঠা। অধিকাংশ মানুষই মাঠা পছন্দ করে না। তবে পছন্দ করলে অবশ্যই পান করে যাবেন। দইয়ের সাথে লেবু, বিট লবণ, বরফ কুচি দিয়ে বানানো হয় মাঠা। গরমের দিনে শরীর ঠাণ্ডা রাখতে খুবই উপকারী। এমনিতে এর নোনতা স্বাদ পানীয়ের স্বাদে ভিন্নতা এনে তৃপ্তি দেয় অনেককে।

মাঠা; Source: লেখিকা

দই, মিষ্টি আর মাঠা সবই তো খাওয়া শেষ হলো। এবার তো ফিরবেন। দই যদি আপনার পছন্দ হয়, তাহলে ফেরার সময় এক হাঁড়ি কিনে নিতে পারেন বাসার জন্য। এমনিতেই এখন প্রচণ্ড গরম। গরমে দই শরীরের জন্য উপকারী। নিজে দইয়ের ভালো একটা স্বাদ পেয়েছেন যখন বাকিদের বঞ্চিত করে রাখবেনই বা কেন!

দই – ৯/১০
মিষ্টি – ৬/১০
মাঠা – ৭/১০

এক প্লেট দই মাত্র ৩০ টাকা। এক হাঁড়ি ১৮০ টাকা, বড় হাঁড়ি ২২০ টাকা করে। মিষ্টি ১৬০ টাকা কেজি থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ২৮০ টাকা কেজি পর্যন্ত আছে। মাঠা প্রতি গ্লাস মাত্র ২০ টাকা।

আর সব পুরনো দোকানের মতোই এটাও সাধারণ একবারেই। আলাদা কিছু নয়। দোকান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে সবসময়েই। দোকানির ব্যবহারও ভালো।

মা বাবার দোয়া মিষ্টান্ন ভান্ডার; Source: লেখিকা

ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারের গোড়াতেই ‘মা বাবার দোয়া মিষ্টান্ন ভান্ডার এন্ড বিরিয়ানি হাউজ।’ হাজী হোসাইন প্লাজার ঠিক বিপরীতে। স্টাফ কোয়ার্টারের চৌরাস্তায় দাঁড়ালে খুব সহজেই চোখে পড়বে।

 

Feature Image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here