নাগরপুরের বিখ্যাত কিছু খাবার

ঐতিহ্যে ভরপুর বাংলাদেশের প্রত্যেক অঞ্চলেরই রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য, রয়েছে নিজস্ব কৃষ্টি, রীতিনীতি খাবার-দাবার, যেগুলোর জন্য আলাদা আলাদাভাবে প্রতিটি অঞ্চলকে শনাক্ত করা যায়। টাঙ্গাইল জেলাস্থ নাগরপুর থানাও এর ব্যাতিক্রম নয়।

নাগরপুরের দীঘি, পাকুটিয়ার জমিদার বাড়ি যেমন নাগরপুরে প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, তেমনই নাগরপুর ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কিছু পরিচিত বিখ্যাত খাবার রয়েছে, যার জন্য ঐ অঞ্চলগুলো নাগরপুর ও তার প্রতিবেশি অঞ্চলগুলোর নিকট বিখ্যাত। আজ সে-কথাই বলবো।

ধুবড়িয়ার চটপটি

টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর থানার একটি গ্রামের নাম ধুবড়িয়া। নাগরপুরের সব গ্রামগুলো থেকে এই গ্রামটি একটু আলাদা। কারণ মফস্বল নাগরপুরের সব গ্রামগুলো যেখানে অজোপাড়া গাঁয়ের মত, ধুবড়িয়া সেখানে কিন্তু তা না। ধুবড়িয়ার বাসিন্দারা আগে থেকেই একটু আধুনিক রুচির মানুষ এবং একটু ঠাট-বাটের জীবনযাপন করে আসছেন।

সেই সূত্রে, আজ থেকে আরো আগে নাগরপুরের মানুষ যেখানে চটপটি চিনতো না, সেখানে তখন থেকেই ধুবড়িয়ায় চটপটি পাওয়া যায়। ফলে তখন থেকে মানুষ ধুবড়িয়ার কল্যাণে এ জনপদ চটপটি চিনে।

কথা সেটা না, কথা বলবো এই চটপটির স্বাদ নিয়ে। অন্যান্য এলাকায় চটপটি যা দিয়ে বানানো হয় ধুবড়িয়ার চটপটিও তাই দিয়েই বানানো হয়। কিন্তু কোথায় যেন একটা ব্যাপার আছে। কেন যেন এই চটপটির স্বাদ অন্যান্য চটপটির চেয়ে আলাদা। আর সেজন্য নাগরপুরের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষও বিভিন্ন উৎসবে কিংবা এমনিতেই ধুবড়িয়া আসে চটপটি খেতে।

আজ নাগরপুরসহ প্রায় এলাকায়ই চটপটি সহজলভ্য হলেও ধুবড়িয়ার চটপটির নিকট সেগুলো কিছুই না। ধুবড়িয়ার চটপটির এই স্বাদের কথা নাগরপুর ছাড়িয়ে টাঙ্গাইল জেলার মানুষের নিকটও পৌঁছে গিয়েছে।

ফলে মাঝে মাঝেই টাঙ্গাইলের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ধুবড়িয়া চলে আসে ধুবড়িয়ার চটপটি খেতে। ধুবড়িয়ায় সর্বপ্রথম কোন কারিগর এই মজাদার চটপটির কারিশমা শুরু করেছিলেন তা আজ কেউ বলতে পারে না। তার সম্বন্ধে কোনো তথ্যও কারও জানা নেই। আজ সে নেই, তবে ধুবড়িয়ার চটপটি তার আধিপত্য এখনো ধরে রেখেছে। ফুলশ্রুতিতে দোকানও একটির জায়গায় এখন আরো কয়েকটি হয়েছে।

স্থান: ধুবড়িয়া তেরাস্তা বাজার।

ধুবড়িয়ার চটপটি (প্রতীকী ছবি); Source: szamin.com

চৌহালীর পিয়াজু

নাগরপুর থানার পার্শবর্তী অঞ্চল চৌহালী। এটি সিরাজগঞ্জ জেলা অধীনস্থ থানা শহর। নাগরপুরের পাশেই অবিস্থত হওয়ার কারণে নাগরপুরের অধিবাসীদের ঐ অঞ্চলে অবাধ যাতায়াত রয়েছে। চৌহালী দুটি কারণে এই অঞ্চলের মানুষের নিকট পরিচিত। এক, চৌহালীর বুক চিরে বয়ে গিয়েছে স্রোতস্বিনী যমুনা। দুই, চৌহালীতে পাওয়া যায় চমৎকার মজাদার ও স্বুসাদু পিঁয়াজু। একবার যে খেয়েছে এই পিয়াজু তার মনে হবে কীসের পিৎজা আর কীসের বার্গার! এর নিকট কোন খাবারেরই পাত্তা নেই।

বর্ষকালে দূর-দুরান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ আসে ভরা যৌবনা নদী উপভোগ করতে। তখন সেখানে এই বিখ্যাত পিয়াজুর রমরমা পসরা বসে। পর্যটকরা লুফে নেয় এই সুস্বাদু পিঁয়াজু। ডাল, বেসন, আটা ও কারিগরের হাতের দিয়ে তৈরি এই পিয়াজুর সুনামের টাঙ্গাইল এবং সিরাজগঞ্জবাসীর অধিকাংশ মানুষেরই জানা।

স্থানঃ জোতপাড়া বাজার।

চৌহালীর পিঁয়াজু (প্রতীকী ছবি); Source: বেশতো

লাভলুর রং চা

এলাকায় গণ্যমান্য ব্যক্তি আসলে লাভলুকে আর দোকানে পাওয়া যায় না। লাভলুর দোকান তখন বন্ধ থাকে। কেননা লাভলুকে তখন পাওয়া যায় ঐ গণ্যমান্য, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাড়িতে। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট লাভলুর এত কী গুরুত্ব যে তাকে বাজার থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়! লাভলু তো হোমরা-চোমরা কেউ না, লাভলু তো সামান্য একজন চা বিক্রেতা। ঠিক এজন্যই লাভলুকে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ তার হাতে জশ আছে। তার চা অন্যদের চেয়ে আলাদা। কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী আদা দিয়ে লেবু দিয়ে এত চমৎকার করে লাভলু চা বানায় যে পান করতেই ইচ্ছে করে।

গয়হাটা বাজারে অবস্থিত লাভলুর চায়ের দোকান। গয়হাটার আশেপাশের দু’চার গ্রামের মানুষের মুখে মুখে লাভলুর রং চায়ের সুনাম। অনেকে গয়হাটা আসে শুধুমাত্র লাভলুর হাতের এক কাপ চা খেতে।

স্থানঃ নাগরপুর থানার গয়হাটা বাজার।

লাভলুর রং চা (প্রতিকী ছবি); Source: ArthoSuchak

ঠাণ্ডু ঘোষের মিষ্টি

দোকানের নাম সাগর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। তবে সবাই ঠাণ্ডু ঘোষে দোকান বলেই ডাকে। কেননা, ঠাণ্ডু ঘোষের হাতের মিষ্টির জুড়ি নেই। ঠাণ্ডু ঘোষের দোকানের চমচম, রসগোল্লা, সন্দেশ, দই, রসমালাই কোন কিছুরই তুলনা হয় না।

নাগরপুর থানায় ঠাণ্ডু ঘোষের মিষ্টির মত নামকরা ও সুস্বাদু মিষ্টি কমই আছে। তবে মিষ্টি ভাল বলে যে দাম বেশি তা কিন্তু নয়। গ্রাম এলাকায় মিষ্টির দাম যেমন, তেমনই ঠাণ্ডু ঘোষের মিষ্টির দাম। তার হাতের ১৬০ টাকা কেজি চমচম বনফুলের চমচমের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা রাখে।

নাগরপুর থানা থেকে শুরু করে সকল অফিস আদালতে ঠাণ্ডুর মিষ্টির চাহিদা রয়েছে। সকলধরনের মিষ্টি পাওয়া যায় ঠাণ্ডু ঘোষের দোকানে। নিজ হাতে দুধ থেকে ছানা কেটে মিষ্টি বানায় ঠাণ্ডু ও তার কর্মচারীবৃন্দ। গুণে ও মানে সেরা ঠাণ্ডু ঘোষের মিষ্টি এখানে সবার পছন্দের মিষ্টি।

স্থানঃ নাগরপুর থানার গয়হাটা বাজার।

ঠাণ্ডু ঘোষের মিষ্টি

 

নাগরপুরের রঞ্জন ঘোষের কাঁচাগোল্লা

কাঁচাগোল্লার নাম শুনলেই ভেতরে ভেতরে একটি লোভ কাজ করে। মনে হয় এখনই খেয়ে আসি একটু। কেননা স্বাদে ও গন্ধে একটি অন্যতম সাতন্ত্র বৈশিষ্টের কারণে মিষ্টির মধ্যে কাঁচাগোল্লাকে অভিজাত শ্রেণির মিষ্টি বলা যায়। আর সেটা যদি হয় নাগরপুরের রঞ্জন ঘোষের কাঁচাগোল্লা, তাহলেতো কথাই নেই। নাগরপুরের রঞ্জন মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কাঁচাগোল্লার স্বাদ জানে নাগরপুরবাসী। নাগরপুরবাসীদের পছন্দের খাদ্য তালিকায় সবসময় প্রথম সারিতে থাকে এই রঞ্জন ঘোষের কাঁচাগোল্লা।

নাগরপুর উপজেলার প্রায় সব এলাকাতেই কম-বেশি কাঁচাগোল্লা পাওয়া যায়। তা সত্ত্বেও কাঁচাগোল্লা কিনতে হলে এ উপজেলার সকল অঞ্চলের মানুষ উপজেলা সদরের রঞ্জন ঘোষের দোকানে আসে। কারণ রঞ্জন ঘোষের কাঁচাগোল্লায় কী যে এক মন মাতানো জাদুকরী স্বাদ আছে, যা হার মানায় অন্যান্য দোকানের কাঁচাগোল্লাকে। এ অঞ্চলে প্রবাসীরা দেশে এলেই রঞ্জন ঘোষের দোকানে যায় কাঁচাগোল্লার স্বাদ নিয়ে তারপর যায় নিজ অঞ্চলের মাটিতে।

কাঁচাগোল্লা; Source: bbarta24

কেননা, তারা প্রবাস যাপনকালে যেমন পরিবারের অভাববোধ করে, পাশাপাশি রঞ্জন ঘোষের কাঁচাগোল্লার অভাবটাও বোধ করে। ইদ পূজা-পার্বনে রঞ্জন মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে কাঁচাগোল্লা বেচা কেনার ধুম লেগে যায়। নাগরপুর সদরের রিকশা স্ট্যান্ডের পাশেই অবস্থিত রঞ্জন মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। দীর্ঘ দশ বছরের বেশি সময় ধরে নাগরপুরে আধিপত্য বিস্তার করছে রঞ্জন ঘোষের বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা।

আজ এখনেই শেষ করছি। পরবর্তীতে অন্য কোনো অঞ্চলের বিখ্যাত খাবারের কথা নিয়ে হয়তো হাজির হবো। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here