বগুড়ার বিখ্যাত চুন্নু চাপ

সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়ার দূরত্ব খুব বেশি নয়। উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বগুড়া শহরে অনেকবার গিয়েছি। তবে প্রতিবারই গিয়েছি কোনো কাজে, তাই কখনও থাকে হয়নি। না থাকার কারণে বগুড়া শহরটাও ভালোভাবে ঘুরে দেখা হয়নি। এবারও গিয়েছিলাম একটা কাজে, কাজের প্রয়োজনে বগুড়া থাকতে হবে। তাই এবার ভেবে রেখেছিলাম, বগুড়া শহরটা ঘুরে দেখবো।

বগুড়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থানের জন্য। কিন্তু মহাস্থানগড়ে আগেও ঘুরতে গিয়েছি, তাই এবার কোনো ইচ্ছা ছিলো না মহাস্থানগড়ে যাওয়ার। বগুড়া পলিটেকনিকে পড়ে জাহিদুল নামে আমার সিরাজগঞ্জের এক বন্ধু।

মহাস্থানগড়; ছবিসূত্র: uttorbangla.com

জয়পুরহাটে এক কাজে যাবো জাহিদুলকে সাথে নিয়ে। তাই আগের দিন বিকালে বগুড়াতে চলে গেলাম। বগুড়াতে রাত কাটিয়ে পরের দিন সকালে জয়পুরহাটে যাবো। তাই বগুড়াতে পৌঁছে বন্ধু জাহিদুলের সাথে ঘুরতে বের হলাম। বগুড়া শহরে বেশকিছু বিষয় লক্ষ্য করলাম। তার মধ্যে ‘স্ট্রিট ফুড’ বা রাস্তার পাশে খাবারের বাহারি আয়োজন দেখলাম। রাস্তার পাশে শিক কাবাবের সাথে ছোট ছোট নান রুটি থেকে শুরু করে চিকেন ফ্রাইসহ অনেক খাবারের সমাহার দেখলাম। তবে বগুড়া শহরের স্ট্রিটফুডের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ‘চুন্নু চাপ’। চুন্নু চাপের সুখ্যাতি বগুড়াকে ছাড়িয়ে পাশের জেলা সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাটসহ আরও অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি সিরাজগঞ্জেই একজনের কাছে শুনেছিলাম ‘চুন্নু চাপ’ এর গল্প। তাই ভাবলাম বগুড়া যেহেতু এসেছি, বগুড়ার বিখ্যাত এই খাবারটির স্বাদ নিতেই হয়। সাধারণত সন্ধ্যার পর থেকে ‘চুন্নু চাপ এন্ড কাবাব ঘর’ এ অনেক ভিড় থাকে। তাই ভাবলাম যখন ভিড়টা কমবে, তখন খেতে যাবো। সেকারণে জাহিদুলকে নিয়ে সাতমাথায় গেলাম। সাতমাথা থেকে পৌরপার্কে গিয়ে একটু ঘুরলাম।

বগুড়ার স্ট্রিট ফুড; ছবিসূত্র: youtube.com

দুই বন্ধু বসে আড্ডা দিয়ে আবার আশেপাশে দিয়ে একটু ঘুরে বেড়ালাম। এরমধ্যে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে বগুড়া পলিটেকনিকের আমার আরেক বন্ধু সাখাওয়াত। রাত নয়টার দিকে তিনজন চুন্নু চাপ খেতে খেলাম। কিন্তু তখনও মোটামুটি ভিড় ছিল। তবু ভেতরে বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। পরে দুইটা ডাবল চাপ আর একটা সিঙ্গেল চাপ অর্ডার করলাম। অর্ডার করার ১০ মিনিটের মধ্যে গরম গরম চাপ আর লুচি আমাদের সামনে চলে এলো। দেরি না করে আমরা খেতে শুরু করলাম।

খাবারের স্বাদ এবং মান

বগুড়া শহরে বেশ কয়েকটি স্থানে চাপ বিক্রি করা হয়। তবে স্বাদ এবং মানের দিক থেকে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ‘চুন্নু চাপ এন্ড কাবাব ঘর’।

মসলা মাখানো চিকেন; ছবিসূত্র: m.somehereinblog.net

যারা কাবাব খেতে পছন্দ করেন, তাদের কাছে চুন্নু চাপ অত্যন্ত সুস্বাদু একটি খাবার। গরুর মাংস পাতলা করে কেটে মাংসের টুকরা দা দিয়ে একটু থেতলানো হয়। তারপর বেশকিছু মসলা দিয়ে মাংসের টুকরাগুলো মাখানো হয়। এরপর মসলাসহ তেলে ভাজা হয়। সাধারণত চাপের সাথে লুচি ও পেঁয়াজ কুচি দেওয়া হয়। তার সাথে থাকে একধরনের মসলা, যেটি চাপের ওপর সামান্য ছিটিয়ে নিয়ে খেতে হয়। এরসাথে আর কোনো কিছু দেওয়া হয় না।

চাপ এবং লুচি; ছবিসূত্র: লেখক

লুচির সাথে চাপ খেতে দারুণ লেগেছে। ‘চুন্নু চাপ এন্ড কাবাব ঘর’ এ গরুর মাংসের চাপ ছাড়াও আরও একটি সুস্বাদু খাবার বিক্রি করা হয়। চাপের মতোই এখানকার চিকেন ফ্রাই বিখ্যাত। পুরো একটি মুরগি মজাদার মসলা দিয়ে মাখানোর পর ডুবো তেলে ভাজা হয়। এরপর মুরগি ছোট ছোট করে নান রুটির সাথে পরিবেশন করা হয়।

পরিবেশ ও পরিবেশন

‘চুন্নু চাপ এন্ড কাবাব ঘর’ মূলত কোনো বড় রেস্তোরাঁ নয়। রাস্তার পাশে ছোট একটি স্থানে বিখ্যাত এই খাবারটি বিক্রি করা হয়ে থাকে। অন্যান্য স্ট্রিট ফুডের দোকানের মতোই এটির পরিবেশ খুবই সাধারণ মানের। এখানে বসার জন্য বেশ কিছু টেবিল রয়েছে। তবে টেবিলে বসে খেতে হলে আপনাকে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কারণ প্রচুর ভিড়ের কারণে এখানে জায়গা পাওয়াটা খুব মুশকিল হয়ে যায়। তাই অধিকাংশ মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেতে পছন্দ করেন। ছোট একটি প্লেটে চাপ, লুচি ও পেঁয়াজ কুচি দেওয়া হয়।

ছবিসূত্র: ফেসবুক

তাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেতে কোনো সমস্যা হয় না। বরং ভেতরের গরমের চেয়ে বাহিরে দাঁড়িয়ে খেতে বেশ মজা পাওয়া যায়। তবে আপনি যদি চান, ভেতরে বসে আরাম করে গল্প করতে করতে খাবেন, তাহলে আপনাকে কিছু সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। খাবারের দোকান হিসেবে এটি কোনো জাঁকজমকপূর্ণ রেস্তোরাঁর মতো নয়। তাই নয়ন জুড়ানো পরিবেশ পাবেন না।

ভাজা হচ্ছে চুন্নু চাপ; ছবিসূত্র: youtube

পরিবেশনটাও খুবই সাদামাটা। তবে ‘চুন্নু চাপ’ গুরুত্ব দিয়ে থাকে তাদের খাবারের প্রতি। ‘চুন্নু চাপ’ আপনাকে মনে রাখার মতো একটি খাবারের স্বাদ উপহার দেবে।

দরদাম

দুই ধরনের চাপ বিক্রি করা হয় এখানে। সিঙ্গেল চাপ এবং ডাবল চাপ। দুইটি লুচিসহ সিঙ্গেল চাপের দাম ৪০ টাকা। আর লুচিসহ ডাবল চাপের মূল্য ৮০ টাকা। এছাড়া আপনি যদি অতিরিক্ত লুচি নিতে চান তাহলে প্রতি পিস লুচির দাম পড়বে ৫ টাকা করে।

সন্ধ্যার পর ভিড় লেগে যায়; ছবিসূত্র: লেখক

অন্যদিকে চিকেন ফ্রাইয়ের দাম ৩২০ টাকা। আর আপনি চাপ বা মুরগির সাথে নান রুটি খেতে চান, তাহলে প্রতি পিস নান রুটির দাম পড়বে ২৫ টাকা। সাথে স্বাভাবিক মূল্যে বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয় পাবেন।

অবস্থান

‘চুন্নু চাপ এন্ড কাবাব ঘর’ বগুড়া শহরের শেরপুর রোডের কলোনি বাজারে অবস্থিত। বগুড়া শহরের সাতমাথা থেকে দক্ষিণ দিকে অবস্থিত বগুড়ার বিখ্যাত এই খাবারের দোকান।

ছবিসূত্র: ফেসবুক

আপনি যদি ঢাকা থেকে বগুড়া যান, তাহলে আপনাকে বগুড়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে অটোতে করে যেতে হবে। আবার চাইলে রিক্সাতেও যেতে পারেন। যেকোনো রিক্সাওয়ালাকে বললেই আপনাকে নিয়ে যাবে। ভাড়া পড়বে মাত্র ১০-১৫ টাকা।

 

Featured Image: youtube.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here