বিক্রমপুরের ঐতিহাসিক ঘোল

বর্তমান মুন্সিগঞ্জ নামে পরিচিত জেলাটির পূর্বনাম ছিল বিক্রমপুর। বিক্রমপুর বাংলার একটি ঐতিহাসিক এলাকা। সুপ্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চল তার বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার জন্য এবং পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক প্রভাবের জন্য সুপরিচিত। বৈদিক যুগ থেকে ভাওয়াল ও সোনারগাঁও রাজধানী হিসেবে আবির্ভূত হবার আগপর্যন্ত এটিই ছিল বাংলার প্রাচীনতম রাজধানী। ধারণা করা হয়, বিক্রমপুর নামটির উৎপত্তি রাজা বিক্রমাদিত্যের নাম থেকে।

এ তো গেল বিক্রমপুরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য। তবে বর্তমান সময়ে বিক্রমপুর নামটির সাথে যে নামটি একদম মিলেমিশে গেছে সেটি হলো “মিষ্টি”। ঢাকা কিংবা দেশের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা “বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার” কিংবা “ভাগ্যকুল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার” নামে যে মিষ্টির দোকানগুলো দেখা যায়, তা মূলত এই মুন্সিগঞ্জের ভাগ্যকুল মান্দ্রা গ্রামের ভাগ্যকুল বাজারের মিষ্টির দোকান থেকেই উৎপত্তি ঘটেছে।

গ্লাস ভর্তি শান্তি; Source: Ishtiaq Ahmed

গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, চিত্তরঞ্জন মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং আনন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার দোকান তিনটি বহুকাল ধরে বংশ পরম্পরায় মিষ্টি বানিয়ে আসছে। গরম গরম রসগোল্লা, দই, কালোজাম, পুডিং, চমচম, ছানা ইত্যাদি বেশ প্রসিদ্ধ এই অঞ্চলে। এদের ছানাটা মুখে দিলে মনে হবে আপনি স্বর্গে চলে এসেছেন খানিকক্ষণের জন্য! যাই হোক, সেসব নিয়ে আরেকদিন লেখা যাবে৷

আজ লিখবো এই মুন্সিগঞ্জ এলাকার অন্তর্গত ভাগ্যকুল মান্দ্রা গ্রামের বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী খাবার “ঘোল” নিয়ে৷

ঘোলের লেবু; Source:  Nowrin Akther

প্রথমেই জেনে নিই ঘোল কী?

দুধ হতে ছানা অপরাসরণের পর অবশিষ্ঠাংশকেই ঘোল বলা হয়। এতে দুধের কেজিন প্রোটিন (Casein) ছাড়া আর সকল উপাদানই বিদ্যমান। ঘোল বা ছানার পানি বিভিন্ন দেশে একটি উপাদেয় পানীয় হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশেও তার ব্যাতিক্রম নয়। তবে এলাকাভেদে এই ছানার পানির সাথে আরও নানা উপাদেয় উপাদান মিশিয়ে বানানো হয় সুস্বাদু ঘোল।

এবার আসুন, জেনে নেই এই অঞ্চলের ঘোলের উপাদানগুলো সম্পর্কেঃ

এখানকার ঘোলে মূলত বিশেষ একধরনের দই, লেবু, লবন, দুধ এবং কিছু গোপনীয় উপাদান ব্যবহার করা হয়। লেবুর সুগন্ধে ভরপুর ঘোলের গ্লাস হাতে নিয়ে চুমুক দিতেই আপনি চোখ বন্ধ করতে বাধ্য। মস্তিষ্ক যেন জগতের বাকি জটিলতা ভুলে যায় মুহূর্তের জন্য। অপরূপ এক শান্তির স্রোত বয়ে যাবে আপনার শরীর বেয়ে। মাঝে মাঝে মুখে অনুভূত হবে দইয়ের সর। এক চুমুকে পুরো গ্লাস খালি করেই তবে আপনার মস্তিষ্ক কাজ করা শুরু করবে, আপনি হারিয়ে যাওয়া জগত থেকে দুনিয়ায় ফিরে আসবেন।

গোবিন্দপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঘোল; Source: plus.goggle.com

আমি এই এলাকার হলেও জন্ম থেকে শুরু করে বেড়ে ওঠা সবটাই ঢাকাতে। তবে বাবার হাত ধরে প্রায়ই যাওয়া হতো গ্রামে। যে কারণেই যাওয়া হোক না কেন, বাবা আর আমি ঘোল খাওয়া মিস করি না কোনোবারই৷ এমনও হয়েছে, ঢাকা থেকে দলবল নিয়ে গ্রামের দিকে রওনা দিয়েছি কেবল ঘোল খাওয়ার জন্য। এক গ্লাস খেয়ে আরেক গ্লাস নেইনি এমন রেকর্ডও তেমন একটা মনে পড়ে না। তবে এক্ষেত্রে সাবধান, ঘোলের নেশায় পরে অতিরিক্ত খেয়ে ফেললে মাথা ঘোরাতে পারে, এমনকি বমিও হতে পারে। কারণ ঘোল পানীয়টা সম্পূর্ণটাই বানানো হয় মিষ্টি দই ও লেবু দিয়ে।

তবে আর দেরি কেন, নিজের দলবল নিয়ে আজই চলে যান মুন্সিগঞ্জের ভাগ্যকুল গ্রামে। ভাগ্যকুল বাজারের ঠিক পাশেই রয়েছে সর্বনাশা পদ্মা নদী, যা ভাগ্যকুল বাজারের প্রায় অর্ধেকটাই গ্রাস করে ফেলেছে ইতিমধ্যে। বাকি অর্ধেকটা কোনমতে বাঁধ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে৷ তাই ঘোল খাওয়ার পাশাপাশি বিস্তীর্ণ পদ্মায় নৌকা দিয়ে ভ্রমণের সুযোগটা মিস করবেন না কোনমতেই৷

ঘোল তৈরির দই; Source: blogbdnews24.com

আমি বলে দিতে পারি, একটু কষ্ট করে গেলেও ঠকবেন না একবারেই। ঢাকার যান্ত্রিক পরিবেশ থেকে মুক্তির সাথে সাথে ঘোল তো খাওয়া হবেই। অনেকদিন অব্দি মনেও থাকবে, বিক্রমপুর গিয়ে চমৎকার স্বাদের ঘোল খেয়ে এসেছিলাম। আবার দেখা যাবে, ঘোল খেয়ে এসে আমার মতোই অন্যদের অভিজ্ঞতা বলে পাঠিয়ে দিবেন বিক্রমপুর।

রেটিং

ঘোল- ৯/১০ (কোন বিতর্ক হবে না)

মূল্য

প্রতিগ্লাস মূল্য ৪০ টাকা। তবে আপনি চাইলে লিটার হিসেবেও নিতে পারে। প্রতি লিটার মূল্য ১৬০ টাকা।
অন্যান্য অঞ্চলের ঘোলের থেকে এখানের ঘোলের দামটা সামান্য বেশিই বলা যায়, তবে মান ও স্বাদে দামটা নেহাতই গৌণ মনে হতে বাধ্য।

পরিবেশ

নরমাল হোটেলের মতই পরিবেশ, তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এদের মূল বৈশিষ্ট্য। দোকানে কোথাও কোন একটা কাগজও পড়ে থাকতে দেখবেন না। টেবিলে রাখা থাকে ডিপ টিউবওয়েল থেকে তোলা পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যসম্মত পানি ভর্তি জগ। যেহেতু হিন্দু দোকান, দোকানে সিলিং এর চারপাশে হিন্দুদের নানা দেবতার ছবি ও মূর্তি দেখতে পাবেন।

লোকেশন

ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে গুলিস্থান আসতে হবে। গুলিস্তান থেকে ‘আরাম’ বাস করে বালাশ্বুর বাজারে নামতে হবে।  ভাড়া ৬০/৭০ টাকা। অথবা ঢাকার পোস্তগোলা থেকে “সোনার হরিণ” নামক বাসে করে বালাশ্বুর বাজার নামতে হবে৷ বালাশ্বুর বাজার থেকে অটো বা রিকশা করে ভাগ্যকুল বাজার যেতে হবে৷ অটো ভাড়া ১০ টাকা।

ভাগ্যকুল বাজারের একটু ভেতরের দিকে পদ্মা নদীর ঠিক পাড় ঘেষেই মিষ্টির দোকানগুলো। আনন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ও গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার দোকানেও ঘোল পাওয়া গেলেও আমার পছন্দ চিত্তরঞ্জন মিষ্টান্ন ভাণ্ডার দোকানের ঘোল। যাওয়ার রাস্তাটা এতোটা ভালো না বলে যেতে একটু কষ্ট হতে পারে। তবে আশা করি ঘোল খাওয়ার পর আর আফসোস থাকবে না একেবারেই।

গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, বিক্রমপুর; Source: Ishtiaq Ahmed

মুন্সিগঞ্জ ছাড়াও দেশের আরো কয়েকটি জায়গায় ঘোল পাওয়া যায়। যেমন: সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, টাঙ্গাইল, পাবনা ইত্যাদি অঞ্চলে। তবে আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, এখানকার ঘোলের থেকে বাকি সব ঘোলকে রেটিঙে নিচেই রাখতে হবে।

 

Feature image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here