বৃষ্টি ঝরা সন্ধ্যা ও কুঁড়েঘর কাবাবের কাবাব-লুচি

টিপটিপ করে পড়তে থাকা সন্ধ্যার বৃষ্টিটা মনে করতে দিলো না জ্বরে ভুগছি। ছোট ভাইকে নিয়ে হাঁটতে বের হলাম। ইচ্ছে হলো কিছু খাবো। এই বৃষ্টিতে ফুচকা, ভেলপুরি কিংবা ঝালমুড়ি খাওয়ার লক্ষ্য ছিলো যদিও!

তবে খানিকটা এগিয়ে, রাস্তার পাশে দাঁড়াতেই চোখ পড়লো মাঝারি আকারের একটি ফুড ভ্যানের দিকে। এখানে এই ফুড ভ্যানটি বেশ আগেও দেখেছিলাম। যে ক’বারই দেখেছি প্রত্যেকবারই বন্ধ ছিলো। তবে আজ আর বন্ধ মনে হচ্ছে না। সামনে লোকজন না দেখা গেলেও এগিয়ে গেলাম সেদিকে।

কুঁড়েঘর কাবাব ফুড ভ্যান; source: লেখিকা

গলিটা খুব বড় নয়, পাশেই অল্প কিছু দোকান। ফুড ভ্যানটির সামনের রাস্তায় বাগান বিলাসের ঝোঁপ, তাতে গোলাপি বাগান বিলাসের ঝাঁক। তার উপর দারুণ বৃষ্টি। ফুড ভ্যানটির দিকে তাকালাম, সাধারণ ও সুন্দর। একটু নিচে তাকাতেই চোখে পড়লো “কুঁড়েঘর কাবাব” লেখাটি।

লাল, নীল, সবুজ নানা রঙের বাতিতে সাজানো ছোট্ট ফুড ভ্যানটি একটু অন্যরকম ভালো লাগছিলো সেসময়। ফুড ভ্যানটির পাশে বসার জন্য রাখা কাঠের ছোট্ট টেবিল, কাঠের টুল। তার ওপর মাটির জগ, গ্লাস ও আরো কিছু সামগ্রী। ছোট্ট কাঠের কুঁড়েঘরের মাঝে বেশ মানিয়ে গিয়েছে বিষয়টি।

মাটির আসবাবপত্র; source: লেখিকা

কাঠের ছোট্ট টেবিলে থাকা অবস্থায় বৃষ্টিতে ভিজছিলো মেন্যু। হাতে নিতেই সামনের দোকান থেকে উঁকি দিলো এখানকার এক লোক। একটু জোরেই জানতে চাইলেন, “আপু কিছু কি লাগবে?”

ভেবেছিলাম, দোকান বুঝি বন্ধ হয়ে গেছে বৃষ্টির কারণে। ইচ্ছেটাকে চাপিয়ে না রেখে জানতে চাইলাম, “এখন কি পাওয়া যাবে খাবার?” ভাইটি জানালেন, অর্ডার করলেই তারা তৈরি করে দেবেন। মেন্যুতে কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে অর্ডার করে ফেললাম চিকেন সাসলিক, চিকেন বটি কাবাব আর ছোট সাইজের লুচি।

মাটির পাত্রে পরিবেশন; source: লেখিকা

অর্ডার করতেই সামনের দোকানের আধ নামানো শাটার গলে বেড়িয়ে এলো ৪ জন ছেলে। মাথায়, হাতে গ্লাভস পরে আছে সবাই। তরুণ এই ছেলেদেরই ‘কুঁড়েঘর কাবাব’। দোকানের ভেতর থেকে বের হয়েই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো খাবার তৈরিতে। বৃষ্টি ততক্ষণে বেড়ে গিয়েছে।

একজন এসে জিজ্ঞেস করলো “আপু বৃষ্টি তো বাড়ছে, এখানেই খাবেন? নাকি পার্সেল হবে”। ছোট ভাইয়ের দিকে একবার তাকিয়ে জানিয়ে দিলাম “এখানেই খাবো।”
৪ জন মিলে গান গাইতে গাইতে সাসলিক আর লুচি তেলে দিলো, কাবাব গরম করলো। তার মধ্যে অনেকের পার্সেলের অর্ডার রেডি করলো। ছাতা মুড়িয়ে অনেকেই এসে নিয়ে গেলো খাবার।

মুরগির বটি কাবাব; source: লেখিকা

মোটামুটি ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষার পর আমাদের চিকেন সাসলিক, চিকেন বটি কাবাব ও লুচিগুলো হাজির হলো। এখানকার সব খাবারই পরিবেশন করা হয়েছে মাটির পাত্রে। বিষয়টি বেশ ভালো লাগছিলো।

তাছাড়া, একপাশে তাকালেই চোখে পড়বে ল্যাম্পপোস্টের নিচে ঝুলে আছে একঝাঁক বাগানবিলাস, গলির এ পাশেই ‘কুঁড়েঘর’ লেখা ছোট্ট সুন্দর ফুড ভ্যানটি, পাশেই রাখা কাঠের টেবিলে সাজানো একগাদা মাটির জিনিসপত্র। সন্ধ্যা জুড়ে বৃষ্টি, তার মাঝে বসে লুচি-কাবাব। আহা! নিঃসন্দেহে এটি হয়ে উঠতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তের একটি।

বৃষ্টি ও কাবাব-লুচি; source: লেখিকা

তবে শুধু তো পরিবেশ আর পরিস্থিতেই পেট ভরবে না! যেহেতু খাবার খেতে বসেছি, তাই বাকি সবকিছুর পাশাপাশি মনোযোগ দিলাম খাবারের দিকেও। পরিবেশ ও সার্ভিস নিয়ে মুগ্ধ হওয়ার পর খাবারের দিকে নজর দিলাম। গরম গরম লুচি ছিঁড়ে, ভেতরে খানিকটা কাবারের মাংস পুরে সালাদ মিশিয়ে মুখে দিতেই আরো অনেকটা মুগ্ধ হতেই হলো।

তখন টের পেলাম এতো এতো পার্সেলের অর্ডার কেনো রেডি করছিলেন তারা। খাবারের স্বাদ ভালো বলেই যে এতো চাহিদা বুঝতে দেরি হলো না। এখানে বসে কিছু লুচি আর কাবাব শেষ করে আরো কিছু অর্ডার করলাম। তারপর পার্সেল নিয়ে নিলাম বাসার বাকিদের জন্য।

খাবারের স্বাদ

কুঁড়েঘরের কাবাব-লুচি; source: লেখিকা

অর্ডার করেছিলাম চিকেন সাসলিক, চিকেন বটি কাবাব ও লুচি (ছোট সাইজের)। সাসলিকে ছিলো চিকেন আর পেঁয়াজের টুকরো। এই ২টি উপকরণেই তৈরি করা হয়েছে সাসলিক। তবে স্বাদের দিক থেকে খারাপ লাগেনি খেতে। মসলার ব্যবহার বেশ ভালো ছিলো।

এছাড়া চিকেন বটি কাবাবও বেশ মজার ছিলো। ছোট সাইজের লুচি দেখে ভেবেছিলাম ভুলে হয়তো বড় সাইজের লুচি ভেজে দিয়েছে, পরে শুনলাম না ঠিকই আছে। লুচি ও বটি কাবাব দুটোই বেশ মজাদার ছিলো। বিশেষ করে এখানকার সালাদ! এটুকু পুরো খাবারে আলাদা এক পূর্ণতা যোগ করেছে।

রেটিং

চিকেন সাসলিক- ৮/১০
চিকেন বটি কাবাব- ৮/১০
লুচি- ৮/১০
সালাদ- ৮/১০

খাবারের মূল্য

কুঁড়েঘর কাবাবের মেন্যু; source: লেখিকা

এখানকার খাবারের মূল্য আমার কাছে বেশ কম লেগেছে। ছোট সাইজের লুচির মূল্য ৫ টাকা (প্রতি পিস), যে সাইজের লুচি অন্যান্য অনেক জায়গার তুলনায় বেশ বড় ছিলো। চিকেন সাসলিক প্রতি পিস ৩০ টাকা। চিকেন বটি কাবাব ৭৫ টাকা।

এরকম কম দামে, এমন স্বাদের খাবার খুব কমই পাওয়া যাবে। তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারবেন, সাথে খরচটা নিয়েও অতিরিক্ত ভাবার কিছু নেই।

পরিবেশ

কুঁড়েঘর কাবাব; source: লেখিকা

মেইন রোডের পাশের গলির মুখেই। মাঝারি আকৃতির ফুড ভ্যান। স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলোর পরিবেশ মূলত যেমন হয়ে থাকে, তবে ‘কুঁড়েঘর কাবাব’-এর লোকজন অন্যান্য সাধারণ ফুড ভ্যান থেকে আরো কিছুটা সুন্দর করার চেষ্টা করেছে ডেকোরেশনে। লাইটের ব্যবহার, কাঠের বসার ব্যবস্থা, মাটির সামগ্রীর ব্যবহার ইত্যাদি মিলিয়ে চোখে আলাদা এক শান্তি পাওয়া যাবে এখানটায়।

বন্ধুদের নিয়ে গল্পে, গানে এখানে সন্ধ্যা কিংবা রাতের আড্ডাটা বেশ জমবে। আজকালকার তরুণদের আড্ডা দেয়ার সুন্দর একটি জায়গা হতে পারে এটি। সাথে ভালো স্বাদের খাবার তো থাকছেই।

সার্ভিস

মোটামুটি তরুণ বয়সের কিছু ছেলেরা এই কুঁড়েঘর কাবাব চালিয়ে নিচ্ছে। সবাই বেশ উদ্যমী ও বিনয়ী। ব্যবহার, অর্ডার নেয়া, পরিবেশন সব মিলিয়ে সার্ভিস বেশ ভালো ছিলো তাদের।

লোকেশন

দক্ষিণ বনশ্রী মেইন রোডের কাছাকাছি। দক্ষিণ বনশ্রী মডেল স্কুলের গলির অপর পাশের রাস্তাটিতে তাকালেই চোখে পড়বে কুঁড়েঘর কাবাবের ফুড ভ্যানটি।

ফিচার ইমেজ- লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here