ভুটানে খাওয়া-দাওয়া

আমার পরিবারের ৫ জনের মধ্যে ৩ জনের দেশের বাইরে পা রাখার সুযোগ হলেও, আমার আর আমার বড় ভাইয়ের কখনো সেই সুযোগ হয়নি বলে প্রায়ই খুব আফসোস করতাম, যে প্লেন এ ওঠা হলো না এখনো। প্রত্যেকবার সবকিছু ঠিকঠাক হওয়ার পর দেখা যায় সময় না মেলার কারণে তা বাদ দিতে হতো, কিন্তু এবার তা হয়নি।

আমার ছোট বোনের বান্ধবীর মা ভুটান যাওয়ার প্রস্তাব দিল আব্বুকে একসাথে আর আব্বু রাজি হয়ে গেলো। সব প্রস্তুতি শেষে ঠিক করলাম কোরবানির ঈদের পরে যাবো। গত সপ্তাহে ঘুরে আসলাম বাংলাদেশের পাশের দেশ ভুটানে। যেহেতু এটি ছিল আমার প্রথম দেশের বাইরের ভ্রমণ, তাই একজন খাদক হিসেবে তাদের খাবার কেমন হবে তা নিয়ে সবথেকে বেশি উৎসুক ছিলাম, বিদেশি খাবারের স্বাদ কেমন হয় তা দেখার অপেক্ষায় ছিলাম।

সকাল ১০:৩০ টায় আমরা পুনাখা, ভুটানে পৌছালাম। আমাদের যে গাইড সাথে ছিল তার নাম ছিল দাওয়া। গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম লাঞ্চের জন্য, মাঝে রাস্তায় পারো নদীতে নেমে কিছুক্ষণ সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। যেই রেস্টুরেন্টে গেলাম তার নাম ছিল “কাজিন”। আমি শুনেই আমার বোনকে বললাম, ওহ! আমার চাচাতো ভাই-বোনের রেস্টুরেন্ট।

ভুটানে গিয়ে বেশিরভাগ যেখানেই খেয়েছি,তা ব্যুফে সিস্টেমে ছিল। আরেকদিন বাইরের একটি রেস্টুরেন্টে খাওয়া হয়েছিল, সে জায়গার নাম ছিল- “রিনচেংলিং ক্যাফেটেরিয়া”। তাছাড়া ব্রেকফাস্ট আর ডিনার আমরা যে দুটি হোটেলে ছিলাম, সেখানেই করেছিলাম, হোটেল দুটির নাম- পুনাসাংস্তু কটেজ ও হোটেল আমোধা।

হোটেল আমোধা অবস্থিত ভুটান এর থিম্পু শহরে ও পুনাসাংস্তু কটেজ ছিল পুনাখাতে। যারা কখনো ভুটান এ যাননি, তাদের জন্য আমার সাজেশন থাকবে একবার হলেও কটেজটিতে ঘুরে আসবেন, চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য। এত সুন্দর করে গুছানো একটি জায়গা মনে হচ্ছিল যে এখানেই ১/২ মাস কাটিয়ে দেয়া যাবে।

পুনাসাংস্তু কটেজ,হোটেল আমোধা ও রিনচেনলিং ক্যাফেটেরিয়া; source:লেখিকা

এক এক করে ব্রেকফাস্ট,লাঞ্চ আর ডিনার বর্ণনায় আসি। কারণ সব জায়গার মেন্যু কিছুটা কাছাকাছিই ছিল।

ব্রেকফাস্ট

ব্রেকফাস্ট করার সুযোগ পেয়েছি ২দিন সকালে, আর দুইদিনই তা ছিল পুনাখাতে পুনাসাংস্তু কটেজে, সেখানে মেন্যু তে যা যা ছিল–

১. ৩ রকম ডিম ভাজি- ডিম অমলেট, মাসালা ডিম ভাজি, নরমাল ডিম ভাজি।

২. আলু পরোটা, ফ্রেঞ্চ টোস্ট

৩. বাটার, পিনাট বাটার, জেলি

৪. কর্নফ্লেক্স,দুধ

৫. চা

প্রথমে তারা কর্নফ্লেক্স পরিবেশন করে গরম দুধের সাথে, তার ৫-৬ মিনিট পর বাকি নাস্তা নিয়ে আসে। আলু পরোটা আর ফ্রেঞ্চ টোস্টের স্বাদ খুব মজার ছিল, বাকি খাবার থেকে।

ভুটানের চায়ের স্বাদ নিয়ে একটু যদি বলি, তাহলে প্রথমেই মনে পড়ে যাবে যে তাদের চায়ে লিকারের পরিমাণ খুব কম থাকার কারণে চা এর স্বাদ ছিল খুব পানসে, যেই চা পান করলে আমাদের দেশের চা-প্রেমীরা খুব কষ্ট পাবে। এখানের আরেকটি জিনিসের তারিফ না করলেই না আর তা হল মাসালা ডিম ভাজি,একটি সুন্দর ঘ্রাণ আসে।

দুপুরের খাবার; source:লেখিকা

লাঞ্চ

৩ দিনের মধ্যে দুইদিন বাইরের রেস্টুরেন্ট, আর একদিন কটেজেই লাঞ্চ করেছিলাম। যাওয়ার দিন হোটেল কাজিন আর মাঝে একদিন রিনচেংলিং ক্যাফেটেরিয়াতে। সম্মিলিত একটি রিভিউ দিচ্ছি, মূলত দুপুরের খাবারে যা যা পেয়েছি ভাতের সাথে–

১. মোমোজ

২. বেগুনী

৩. সবজি

৪. চিকেন

৫. চাটনি

৬. স্পেগেডি

৭. পালং শাক

৮. আলুর কোরমা

৯. বাঁধাকপি

এতক্ষণে খাবারের ধরন পড়ে হয়তো আপনারা বুঝে গিয়েছেন যে ভুটানীরা ভেজেটিরিয়ান। এর মাঝে একটু স্বস্তি দিয়েছিল চিকেন আইটেমটি তা না থাকলে হয়তো কষ্টে পড়ে যেতে হতো আমার কারণ কয়জন বাঙালিই বা আমরা ভেজেটেরিয়ান হয়ে থাকি?

আচ্ছা, বলে রাখা ভালো ভুটানীরা খাবারে লবণ ও মরিচ ব্যবহার করে না বললেই চলে, আর সাথে স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করেই হয়তো বাকি মসলার পরিমাণ খুবই কম রাখে ও সে-কারণে প্রত্যেকবার আলাদাভাবে লবণ মরিচ নিয়ে বসতে হয়েছিল আমাদের। ভাত আর স্পেগেডি ছিল শক্ত।

কিন্তু আপনারা যারা ভেজেটেরিয়ান তাদের কাছে অনেক ভালো লাগবে সবজির আইটেমগুলো। এগুলোর মধ্যে আলুর কোরমা আর পালং শাকের আইটেমটি আমার ভালো লেগেছিল,আলুর কোরমার ঝোলটি অনেক মজার ছিল।

ভুটানের বিভিন্ন খাবার; source:লেখিকা

ডিনার

ডিনার করে হয়েছে দুইদিন পুনাখাতে যেই হোটেলে ছিলাম, সেখানে আর একদিন থিম্পুতে যেখানে ছিলাম হোটেল আমোধাতে। মেন্যুতে যা যা ছিল-

১.মিক্সড ভেজেটেবল স্যুপ

২.টমেটো স্যুপ

৩.মিক্সড সবজি

৪.ডাল

৫.বান্দী মাসালা

৬.চিকেন কারী

৭.চাটনি

৮.করলা ভাজি

প্রথমেই তারা যেকোনো রকমের স্যুপ পরিবেশন করতো, আমি জানি না আমার মতন কয়জন আছেন এখানে যারা একবারেই টমেটো খেতে পারেন না, কিন্তু তারপরেও টমেটো স্যুপটা এত মজার লেগেছিল। ভেজিটেবল স্যুপ মুখে দিয়েই মনে হয়েছিল যে, হসপিটাল এ রোগীর খাওয়ার জন্য যে স্যুপ দেওয়া হয় কিছুটা তেমন।

দুই রকম রুটি পরিবেশন করা হয় তার মধ্যে একটি লাল আটার রুটি। বাংলাদেশে লাল আটার রুটি অনেকেই খেতে পারেন না, কিন্তু তাদের লাল আটার রুটি আমাদের সবারই অনেক ভালো লেগেছিল। সাথে আরেক প্রকার রুটি ছিল, কিছুটা পাপড় এর মতন কিন্তু অনেক ঝাল। সাথে একটি ঝাল চাটনি পরিবেশন করে, যা দিয়ে আপনি একাই ১০-১২ টি রুটি শেষ করে ফেলবেন, এত মজা ছিল!

বান্দী মাসালাটি ছিল মূলত ঢেঁড়স ভাজি, আমার খুব পছন্দের একটি সবজি। খুব অল্প সংখ্যক মানুষ যাদের করলা পছন্দ, তাদের মধ্যে আমি একজন, আর যে করলা ভাজি পরিবেশন করা হয়েছিল তা একটু আলাদা ছিল। ডিপ ফ্রাই করা ছিল করলাটি, খেতে অনেকটা চিপস এর মতন লাগছিল।

প্রত্যেক বেলার খাবার শেষেই তারা ডেজার্ট হিসেবে মিষ্টি কিছু দিয়ে থাকে- আইসক্রিম অথবা রসগোল্লা অথবা লাল জাম। রসগোল্লা ও লাল জাম অনেক মজার ছিল,খুব মিষ্টিও না, আবার একদম মিষ্টি ছাড়াও না যেনো কারো অতিরিক্ত মিষ্টি নিয়ে সমস্যায় পড়তে না হয়।

ভুটানের রসগোল্লা; source:লেখিকা

আমি মূলত একটু বেশিই খাদক, তাই আসার দিন আমাদের গাইডকে বললাম, “ভুটান অবশ্যই একটি অতি সুন্দর দেশ কিন্তু আমাদের দেশে আসলে বুঝবেন খাদ্যের রকমারি কাকে বলে, কিন্তু যারা আমাদের দেশে ডায়েট করা নিয়ে অনেক চিন্তা করে নিঃসন্দেহে তাদের জন্য ভুটানের খাদ্য মেন্যু একদম পারফেক্ট হবে”।

সব মিলিয়ে যদি রেটিং করতে হয় তবে আমি ৭.৫/১০ করবো।

শেষ কষ্টের কথা বলে লেখাটির সমাপ্তি টানছি, ভুটানে সন্ধ্যাবেলার নাস্তা করার কোনো ব্যবস্থা কোনো হোটেলেই চোখে পড়েনি, আহা রে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here