মাংসে ভরপুর ‘কফি কুকার্স সেভেন’এর বিফ খিচুড়ি

জীবনে একবার হলেও যার এসাইনমেন্ট সাবমিট করতে হয়েছে, সেই কেবল জানে এর ব্যথা ঠিক কতটুকু। সেটা হোক একাডেমিক বা নন-একাডেমিক। সেদিন একটি এসাইনমেন্টের সাবমিশান ডেট ছিলো। সাবমিট করে আর তার সাথে ট্রেইনারের ঝাড়ি খেয়ে মন ছিলো বিষিয়ে। ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে মন ভালো করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছিলাম। আর হুটহাট মন ভালো করতে খাবারের বিকল্প বলতে পারবে কেউ?

কাওরান বাজারেই আমার কাজ ছিলো। কয়েকদিন টানা ওখানে যাওয়ার পরেও ব্যস্ততার জন্য আশপাশ ঘুরে খাওয়া হয়নি। প্রজাপতি গুহার কাছের কফি কুকার্স সেভেনের কথা এর আগে অনেক শুনেছি। বিশেষ করে ওখানের খিচুড়ির কথা। খিচুড়ি প্রেমী অনেকের রিভিউ থেকে জেনেছি, ঢাকার সেরা দশটা খিচুড়ির একটা কফি কুকার্স সেভেনের খিচুড়ি। সেদিন ওখানের কাজের শেষদিন ছিলো আর ঝাড়ি খেয়ে তো মনের ছিলো বেহাল দশা। তাই ভাবলাম খেয়েই নেই সেই খিচুড়ি।

মাংসে ভরপুর খিচুড়ি; Source: লেখিকা

তো ঢুকে গেলাম কুকার্স সেভেনে। বাইরের দিকটায় না বসে ভেতরের দিকটাতেই গিয়ে বসি। সাথে সাথে কালো পোশাক পরা একজন ওয়েটার এগিয়ে আসে। ওখানের ফ্যান আর এসি দুটোই চালিয়ে দিয়ে যায়। মনে মনে বলি “বাব্বাহ্! আমি কতোই না ভিআইপি! একই সাথে ফ্যানের সাথে আমার এসিও আছে!”

যাই হোক, ভালোই লাগলো ব্যাপারটা। এরপর মেন্যু নিয়ে চোখ বোলানো শুরু করলাম। যেহেতু খিচুড়ি খাবো ঠিক করাই ছিলো, তাই মেন্যুর বাংলা খাবারের অংশটাতেই চলে গেলাম। আগে থেকেই জানতাম চার ধরনের খিচুড়িই আছে ওখানে। বিফ খিচুড়ি, চিকেন খিচুড়ি, ইলিশ খিচুড়ি আর প্লেইন খিচুড়িই কফি কুকার্স সেভেনের খিচুড়ির আইটেম।

খিচুড়ি সবসময়ই মুরগির মাংসের চেয়ে গরুর মাংস দিয়ে খেতে বেশি মজা। তাই এতকিছু না ভেবেই বিফ খিচুড়ি অর্ডার করে দেই। অবশ্য হাফ খিচুড়ি অর্ডার করবো নাকি ফুল করবো তা ভাবতে সময় নিয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত ফুলটাই অর্ডার করে দেই।

কফি কুকার্স সেভেন; Source: লেখিকা

অর্ডার করার পর দুই মিনিটও অপেক্ষা করতে হয়নি। বলতে গেলে সাথে সাথেই নিয়ে আসে ওয়েটার। খিচুড়ি সামনে আসার পর আমি হতাশ, পরিমাণ দেখে। ফুল খিচুড়ি অর্ডার করে যদি এতটুকু পাই প্লেটে, তাহলে হাফটা অর্ডার করলে বোধহয় প্লেট দেখে দুঃখে- কষ্টে মারাই যেতাম।

কিন্তু কষ্ট নিয়ে বসে থাকলে তো হবে না, এই কষ্ট কমাতেই খাওয়া শুরু করতে হবে। তাই হাতটা ধুয়ে এসে বসে পড়লাম। তারা চামচ দিয়েছিলো, কিন্তু খিচুড়ি কী আর চামচ দিয়ে খেয়ে আশ মেটে!

খিচুড়িটা ভাঙ্গার পরেই আমার মন খারাপ এক ধাক্কায় উড়ে গেলো। ভেতরে খিচুড়ি কম, মাংস বেশি। যদিও আগে থেকেই জানতাম, এই খিচুড়িটায় মাংস বেশি। তবুও এতটা আশা করিনি। খেতে খেতে মনে হয়েছিলো আমি আসলে ভূনা খিচুড়ির সাথে গরুর মাংস খাচ্ছি না, খাচ্ছি গরুর মাংসের সাথে ভূনা খিচুড়ি!

এটা আমার খাওয়া প্রথম এত বেশি পরিমাণে মাংস দেয়া খিচুড়ি। খিচুড়ি পরিমাণে অল্প ছিলো বলে যে হতাশা পেয়ে বসেছিলো, গরুর মাংসের পরিমাণ দেখে সেই হতাশা আনন্দে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিলো।

কুকার্সের মজাদার খিচুড়ি; Source: লেখিকা

খাওয়া শুরু করার পর বুঝেছিলাম কেন এই খিচুড়িকে ঢাকার সেরা খিচুড়ির একটা বলে। খিচুড়ির স্বাদটা যতটা মজার তার চেয়ে দ্বিগুণ বাড়িয়ে তোলে মাংসগুলো। খিচুড়িটা খাওয়া শেষ হয়ে গেলেও আমার প্লেটে চার টুকরো মাংস রয়ে গিয়েছিলো। আপনি পরিমাণে বেশি খেতে ভালোবাসলে পেট ভরার নিশ্চয়তা আমি দিতে পারি না। তবে মন ভরার নিশ্চয়তাটা দিতেই পারি। গরুর মাংসের এই চড়া বাজারে এমনভাবে মাংস দেয়া খিচুড়ি দেখলে মন তো এমনিই ভরে যাবে।

খিচুড়ির সাথে সালাদ হিসেবে কয়েক টুকরো শসাই দেবে শুধু আর দু- টুকরো লেবু, দুটো কাঁচা মরিচ। ঝাল খেতে চাইলে কাঁচা মরিচ মেখে নিন। খিচুড়িটায় একদমই ঝাল দেয় না। বাচ্চা নিয়ে খেতে গেলে ঝাল নিয়ে এজন্যই কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না। চাইলে খিচুড়ির সাথে আলাদা অর্ডার করে নিয়ে নিতে পারেন সালাদ বা রায়তা। আরো ভারী খেতে চাইলে নিতে পারেন ইলিশ বা রূপচাঁদা ভাজাও। যেভাবে খেতে আপনার ভালো লাগে এবং পকেটের অবস্থাও ভালো থাকে।

নান্দনিক বিলটি; Source: লেখিকা

আপনি যদি এই রিভিউ পড়ার পর খেতে যান, তাহলে আমার ছোট্ট একটা পরামর্শ থাকবে। একটা বৃষ্টির দিন দেখে যান। এই খিচুরির আর বৃষ্টি মিলে আপনার একটা দিনকে করে তুলবে অনন্য। আর খুব বেশি খাবার নিয়ে পাগলামি করার অভ্যাস থাকলে, বাসা থেকে একটু আচার নিয়ে বের হতে পারেন। খিচুড়ি, আচার আর বৃষ্টি। আহ্, আর কী চাই!

রেটিং

বিফ খিচুড়ি – ৮/১০

মূল্য

পরিমাণে এত অল্প বিফ খিচুড়ির জন্য যখন আপনাকে ২৫০ টাকা গুনতে হবে, তখন খুব বেশি কষ্ট লাগতেই পারে। কিন্তু যখন চোখ বন্ধ করে প্রতি লোকমায় পাওয়া গরুর মাংসের কথা ভাববেন তখন আর আফসোস থাকবে না।

মূল্যতালিকা; Source: লেখিকা

পরিবেশ

মোটামুটি মানের যেকোনো রেস্টুরেন্ট যেমন হয়, কফি কুকার্স সেভেন তেমনই। আরামে বসে খাওয়ার নিশ্চয়তা তারা দেবে আপনাকে। তবে খুব বেশি আয়েশ করতে চাইলে সেটা পাবেন না। চেয়ার, টেবিল সবই কাঠের তৈরি। সামনের দিকটায় একেবারেই সাধারণভাবে চেয়ার টেবিল পাতা। ভেতরের দিকটায় একটু সাজানো।

আমি বলবো সব মিলিয়ে খারাপ না। ওয়েটারদের ব্যবহারও যথেষ্ট ভালো। যেভাবে খুব তাড়াতাড়ি খাবার পরিবেশন করেছিলো! আবার, সেভাবেই খাওয়ার পরপরই টেবিল পরিষ্কার করে দিয়েছিলো।

লোকেশন

৩৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, ভিআইপি রোড, কাওরান বাজার ১২১৫, ঢাকা। (প্রজাপতি গুহার পাশেই)

 

Feature Image: লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here