সীতাকুণ্ডের সবজি বিরিয়ানি

বিরিয়ানি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে- ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশে প্রচলিত এক বিশেষ প্রকারের খাবার। যা সুগন্ধি চাল, ঘি, গরম মশলা ও মাংস মিশিয়ে রান্না করা হয়। এর বিভিন্ন প্রকারভেদ সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকলেও সবজি বিরিয়ানি সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুবই কম।

বেশ কিছুদিন আগে একদিনের জন্য গিয়েছিলাম সীতাকুণ্ড। ঘোরাঘুরির মাঝে সেখানেই গোবিন্দ হোটেলে খোঁজ পেলাম মজাদার সবজি বিরিয়ানির। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই লিখবো আজ।

সীতাকুণ্ড এখন পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের জন্য একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান। রোজ হাজারো মানুষ ঘুরতে যাচ্ছেন সেখানে। যাওয়ার আগে খাদ্যপ্রেমীরা খবর নিয়ে যান কী খাবেন সেখানে। তাদের সুবিধার জন্য এই লেখাটি। ঘোরাঘুরি করে ভারি খাবার না খেয়ে এই সবজি প্রধান বিরিয়ানিটি খেলে ক্লান্তিও আসবে না। তাই সীতাকুণ্ড ঘুরতে গেলে খাবারের তালিকায় যুক্ত করে নিতে পারেন এটি।

নিরামিষ তরকারি; source: লেখিকা

সবজি পোলাও বা সবজি বিরিয়ানি হলো মাংস বা আমিষবিহীন সুগন্ধী চালের বিরিয়ানি, যা বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু সবজি দিয়ে বানানো হয়। তবে সীতাকুণ্ড বাজারের অবস্থিত ‘শ্রী গোবিন্দ হোটেল’ এর সবজি বিরিয়ানি কিছুটা ভিন্ন ও খুবই মজাদার। ওই হোটেলটি ছিলো নিরামিষভোজীদের জন্যই বিশেষভাবে বানানো। তাই সেখানে কোনো ধরনের আমিষ জাতীয় খাবার পাওয়া যায় না।

সীতাকুণ্ড বাজারে নেমে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে ‘শ্রী গোবিন্দ হোটেল’টি। সরু সিঁড়িপথ ধরে উপরে উঠতেই চোখে পরবে বেশ সুন্দর ও গোছালো হোটেলটি। টেবিলে বসে হোটেল বয় এলে অর্ডার দিতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় পিতলের থালায় নিয়ে আসা হবে সবজি পোলাও। সাথে ছোট ছোট পিতলের বাটিতে সাজিয়ে নিয়ে আসা হবে বিভিন্ন ধরনের সবজি। খাওয়া শুরুর আগেই এমন লোভনীয় পরিবেশন দেখে আপনার ক্ষুধা বেড়ে যাবে বহুগুণে।

শ্রী গোবিন্দ হোটেল; source: লেখিকা

এখানকার সবজি বিরিয়ানিটা দেখতে অনেকটা লালচে। থালায় বিরিয়ানির সাথে দেয়া হয় বেগুনী। নিরামিষ খাবারের হোটেলগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, তারা ভাত অথবা সবজি পোলাও খাওয়া শুরু করে বেগুনী ভাজা দিয়ে। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়।

গাজর, বরবটিসহ আরও নানা ধরনের সবজি মিশ্রিত পোলাওটি বেশ মজাদার ও ভিন্ন স্বাদের। পোলাওটিতে তেল খুব কম ব্যবহার করায় স্বাস্থ্য সম্মতও বটে। সবজি জাতীয় খাবার খেলে শরীরে ক্লান্তিও কম আসে।

সবজি বিরিয়ানির সাথে আপনি নিতে পারবেন যেকোনো একধরনের সবজির তরকারি। ছোট বাটিগুলোর তরকারি শেষ করে, চাইলে বেশিও নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে, বাড়তি সবজিগুলোর জন্য বাড়তি দাম দিলেই হবে। আমরা ছয় জন ছিলাম বলে ছয় ধরনের সবজি নিয়ে সবাই সবগুলো তরকারি চেখে দেখেছি।

সবজি বিরিয়ানি; source: লেখিকা

তরকারিগুলোর মধ্যে পাবেন- সয়াবিন বড়ির তরকারি, ডালের বড়ার তরকারি, আলু পটলের তরকারি, কচু শাঁক, পনিরের তরকারি, চাল-কুমড়ার তরকারি ইত্যাদি। সবগুলো তরকারি মজা হলেও আমার কাছে সয়াবিন বড়ির ও পনিরের তরকারি সবচেয়ে বেশি ভালো ও আলাদা লেগেছে।

এখানে বলে রাখা ভালো নিরামিষ রান্নায় পেঁয়াজ ও রসুন ব্যবহার করা হয় না। তাই আমাদের সচরাচর খাবারগুলো থেকে স্বাদে ও ঘ্রাণে অন্যরকম লাগবে। অল্প অল্প করে প্রতিটি পদই চেখে দেখার চেষ্টা করতে পারেন। ওদিকে তো আর রোজ যাওয়া হবে না।

আপনি চাইলে, প্রতিটি পদ আবার রিফিল করে নিতে পারবেন। তবে এরজন্য কোন বাড়তি টাকা নেয়া হবে না। সবজি পোলাও খাওয়ার সাথে ড্রিংকস হিসেবে কোক, ফান্টা, মাউন্টেন ডিউ বা স্প্রাইট নিতে পারবেন। বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এখানে পাবেন কাঁচা সয়াবিন বড়ি ও পনির।

এত এত খাবারের চক্করে পরে ভরপেট খেয়ে ফেলতে পারেন নিজের অজান্তেই। তবে যেহেতু ঘোরাঘুরি উদ্দেশ্যেই সীতাকুণ্ড যাওয়া হয়, তাই পরিমিত পরিমাণে খাওয়াটাই আপনার জন্য মঙ্গলজনক। নইলে আবার অসুস্থ হয়ে ট্যুরটাই মাটি হয়ে যেতে পারে।

হোটেলটির সাজসজ্জা; source: লেখিকা

খাওয়া শেষে এখন ডেজার্টের পালা। ডেজার্ট হিসেবে এখানে পাবেন দই ও ফিরনি। তবে অবশ্যই দই টেস্ট করবেন, বেশ সুস্বাদু ও হালকা মিষ্টি সম্পন্ন। আমার বেশ ভালো লেগেছে। ফিরনি খেতে খারাপ না।

রেটিং

সবজি বিরিয়ানি: ৮/১০
পনির ও সয়াবিন বড়ির তরকারি: ৭/১০
দই, ফিরনি: ৭/১০

মূল্য

সবজি বিরিয়ানি (এক পদের তরকারিসহ) ৭০ টাকা। এছাড়া প্রতিটি তরকারি ২৫-৩০ টাকা বাটি।

পরিবেশ

ছিমছাম ছোট গোছালো মাঝারি সাইজের হোটেল, তবে চারদিক বেশ পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। সাধারণ হোটেলের মতো চেয়ার টেবিল। গ্লাস থেকে শুরু করে সকল তৈজসপত্রই কাসা ও পিতলের তৈরি যা দেখতেও বেশ আকর্ষণীয়।

হোটেলটির পরিবেশ; source: লেখিকা

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে উঠে সীতাকুণ্ড বাজারে নামতে হবে। অথবা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী যেকোনো বাসে উঠে সীতাকুণ্ড বাজারে নামতে হবে। মহাসড়ক থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ৫ মিনিট হাঁটলেই দেখতে পাবেন ‘শ্রী গোবিন্দ হোটেল’। সুবিধার জন্য স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে নিন।

খাওয়- দাওয়া বাদে সীতাকুণ্ড ঘোরাঘুরি ও রোমাঞ্চকর ভ্রমণের জন্য আদর্শ জায়গা। হিন্দুপ্রধান এলাকা বিধায় এই এলাকায় জালের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মন্দির। যার কিছু কিছু বেশ পুরোনো। আছে চন্দ্রনাথ মন্দির, যা আড়াই হাজার সিঁড়ি পাড়ি দিয়ে যেতে হয়। সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে আছে অনেক সুন্দর সুন্দর বিচ। যার মধ্যে বাঁশবাড়িয়া বিচ, গুলিয়াখালী বিচ ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে বেশ সরগরম।

পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এখানে আছে প্রায় দশটি ট্রেইল ও ঝর্ণা। যার মধ্যে খইয়াছড়া, সুপ্তধারা, সহস্রধারা বিখ্যাত। তো যেতেই পারেন হুট করে সীতাকুণ্ড। ঘোরার সাথে সাথে খেয়েও আসতে পারবেন ভিন্ন জাতীয় খাবার।

 

ফিচার ইমেজ – লেখিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here