খাগড়াছড়ির বিখ্যাত সিস্টেম রেস্টুরেন্টে খাওয়ার অভিজ্ঞতা

ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি-সাজেক-খাগড়াছড়ি ঘুরে শরীরের অবস্থা তখন বেহাল। বিশেষ করে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ি এসে আলুটিলা ঘুরে তারপর গিয়েছিলাম রিসাং ঝর্ণায়। এই রিসাং ঝর্ণায় যাওয়া জীবনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার খাতায় লেখা থাকবে। ঝর্ণার নিচে যাওয়ার পথটা যতোটা পিচ্ছিল, তারচেয়েও ভয়ংকর এতে স্লাইড দেয়ার অভিজ্ঞতা। স্লাইড দেবো না দেবো না করেও হঠাৎ করে দিয়েই দেই। আর তার ফলস্বরূপ হোটেলে ফেরার পথেই জ্বর মহাশয়ের আগমন।

হোটেলে ফেরার পর দেখি আমি একরকম শেষ। আবার পরদিন সারাদিন ঘুরে ঢাকায় ফিরতে হবে। তাই বিশ্রাম নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। সেটাই করছিলাম। কিন্তু যখন মনে পড়লো রাতের খাবারটা খাবো খাগড়াছড়ির বিখ্যাত সিস্টেম রেস্টুরেন্টে, তখন কী আর চার দেয়ালে মন টেকে! শরীরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উঠেই পড়লাম। এই গরমের দিনে গায়ে শীতের চাদর চাপিয়ে রওনা দিলাম সিস্টেমের উদ্দেশে। খাদক আর কাকে বলে!

থানকুনি পাতার ভর্তা; Source: লেখিকা

অটোরিকশা দিয়ে যেতে যেতে খাগড়াছড়ি শহরটা দেখছিলাম। একবারেই ছোট আর সাধারণ একটা শহর। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম সিস্টেম রেস্টুরেন্টে। ঢুকতে গিয়ে মনে হলো, কারো বাড়িতে দাওয়াত খেতে এসেছি। সামনের খোলা বারান্দায় বাঁশের বেড়া দেয়া। এরমধ্যে সাধারণ কাঠের সোফা পেতে রাখা। দেখে মনেই হয় না একটা রেস্টুরেন্টের বারান্দা এটা। একটা মফস্বলের মধ্যবিত্ত বাড়ির চেহারাই ফুঁটে উঠবে যে কারো চোখে।

এরপর ভেতরে ঢুকে পড়লাম। বারান্দাটা রেস্টুরেন্ট মনে না হলেও, ভেতরটা মনে হবে। তবে ঢাকার গতানুগতিক যে সমস্ত রেস্টুরেন্টে খেয়ে অভ্যস্ত তেমন না। ভেতরের দেয়ালগুলোতে সব বাঁশের বেড়া। এছাড়াও বাঁশ দিয়ে তৈরি নানা উপকরণ দিয়ে ডেকোরেশান করা। আরো ছিলো পাহাড়ি ছাতা, উপজাতিদের তৈরি ওড়না ইত্যাদি। সারি সারি টেবিল পাতা একেক পর এক। লাইটিংটা ছিলো আধো আলো আধো ছাঁয়ার। সব মিলিয়ে ইন্টেরিওর যেন এক ধাক্কায় নিয়ে যায় শহরের সব জঞ্জাল আর ব্যস্ততা থেকে অনেক দূরে।

কচি বাঁশ দেয়া ডাল; Source: লেখিকা

সবটা রেস্টুরেন্ট ঘুরে তারপর একটা টেবিল দেখে বসে পড়লাম। আমরা গিয়েছিলাম মোট সাতজন। সবারই ইচ্ছে ছিলো বাঁশের বিরিয়ানি খাওয়ার। কিন্তু, ওয়েটারকে বাঁশের বিরিয়ানি দিতে বলায় সে জানালো কমপক্ষে ৪৫ মিনিট আগে অর্ডার করতে হয়। সারাদিনের ক্লান্তি আর ক্ষুধায় আমাদের এতোক্ষণ অপেক্ষা করার ধৈর্য ছিলো না। তাই ওদের রাতের খাবারের মেন্যু দেখা শুরু করলাম।

মেন্যু দেখে ‘লাঞ্চ বক্স’ নামের একটি সেট পছন্দ করলাম। বাঁশে রান্না করা মাছ আর মুরগির পদ ওদের স্পেশাল হলেও, ওগুলো চেখে দেখার মতো আমাদের পকেটের অবস্থা ছিলো না। তাই সাধ্যের মধ্যে সবটুকু সুখের চিন্তাই করতে হলো। অর্ডার দিয়ে বসতে না বসতেই খাবার আসা শুরু করে দিলো। ক্ষুদার্থ কয়েকটি মানুষ যেন প্লেটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।

হাঁসের কালাভুনা; Source: লেখিকা

আমাদের অর্ডার করা মেন্যুতে ছিলো- সাদা ভাত, দেশি মুরগির মাংস/হাঁসের কালাভুনা, লাউ চিংড়ি, ছুড়ি শুঁটকি ভর্তা আর কচি বাঁশ দিয়ে ডাল। এই মেন্যু ছাড়াও আমরা থানকুনি পাতার ভর্তা আর মাশরুম ভাজি অর্ডার করেছিলাম। ভাতের পরেই নিয়ে আসে লাউ চিংড়ি আর ডাল। ওখানের আরো খাবার দোকানে এটা লক্ষ্য করেছি। ডালটা শুরুতেই সার্ভ করে। এমনিতে তো আমরা ডাল খাই সবার শেষে। ওই এলাকার রীতিতে ডাল দেয়া হয় শুরুতেই।

বিশাল এই ট্যুরে আমি যতো খাবার খেয়েছি তারমধ্যে সেরা ছিলো সিস্টেমের খাবার। এতো সাধারণ পদগুলো এতো মজা করে রান্না করেছিলো, যার স্বাদ কখনোই ভোলা যাবে না। শুধু পেট ভরে না, তার সাথে অনেকটুকু তৃপ্তি নিয়ে খেতে খাগড়াছড়ি গেলে সিস্টেমে অবশ্যই খেয়ে আসবেন। আর হাতে সময় থাকলে খেয়ে আসবেন বাঁশের বিরিয়ানি। আগে থেকে ফোন করে বলে রাখলে আরো সুবিধে।

মাশরুম ভাজি; Source: লেখিকা

আর পকেটে যদি শূন্যতা না থেকে পূর্ণতা থাকে, তবে অবশ্যই বাঁশে রান্না করা মাছ আর মুরগি খেয়ে আসবেন। এই স্বাদ অন্য কোথাও আর পাবেন না। ছোট মাছের রসাই ভুনা নামের একটা পদ আছে, ওটাও খাবারের তালিকায় না থাকলে আফসোস থেকে যাবে। যেমন আমার আছে। আসলে সিস্টেমের কোনো একটা খাবার পাইনি, যার দুর্নাম করতে পারবো। প্রত্যেকটা খাবার এতো সুস্বাদু ছিলো, যেটা একরকম দূর্লভ ব্যাপার। একটা রেস্টুরেন্টের তো কখনোই সবগুলো খাবার মজার হয় না।

এখন আসি খাবারের কথায়। লাউ চিংড়িতে আমি আম্মুর হাতের রান্নার স্বাদ পেয়েছি একেবারে। কচি বাঁশের ডাল তো আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। ওদিকের ডালটা এতো সুস্বাদু। সাজেকে দেখেছিলাম কয়েক ধরনের ডাল একসাথে বেটে ডাল রান্না করে। সিস্টেমেও সম্ভবত একই রকম ছিলো।

এরপর আসি মাশরুম ভাজির ব্যাপারে। মাশরুম আমার খুব প্রিয়। আর সিস্টেমে মাশরুমের সাথে ঝুড়ি করা ডিম দিয়ে অসাধারণ একটা ভাজি করেছিলো। থানকুনি পাতার ভর্তার মতো ভর্তা আমি কখনোই খাইনি।

দেশি মুরগির মাংস; Source: লেখিকা

ভর্তাটা বেঁটে বা ছেঁচে করেনি, শুধু পাতাগুলো একটু চটকে সাথে বড় করে কাটা পেঁয়াজ আর পাতলা করে কাটা টমেটোর ফালি দিয়ে। সাথে দিয়েছিলো সরিষার তেল। আমাদের কপাল খারাপ, শুঁটকি ভর্তা শেষ হয়ে গিয়েছিলো। যার বদলে মাশরুম ভাজি দেয় তারা। মুরগির মাংসটাও অসাধারণ ছিলো। আমি মুরগি না নিয়ে হাঁসের কালাভুনা নিয়েছিলাম। ঝাল ঝাল হাঁসের কালাভুনার স্বাদ আমার অনেক বছর মনে থাকবে।

রেটিং

রেটিং দিতে গেলে অবশ্যই চোখ বন্ধ করে ৯/১০

মূল্য

আমাদের সব মিলিয়ে বিল এসেছিলো ১৪০০+ টাকা। কোনোরকম ভ্যাট বা সার্ভিস চার্জ নেই। যদিও খাবারের দাম একটু বেশি। তবে আমি বলবো, খাগড়াছড়ি গেলে সিস্টেমে না খেয়ে ফিরে আসবেন না।

মূল্যতালিকা; Source: লেখিকা

পরিবেশ

চমৎকার নান্দনিক এক পরিবেশ সিস্টেম রেস্টুরেন্টের। বাঁশের ডোকোরেশান দেখে যেকারো ভালো লাগবে। প্রত্যেকটি স্টাফের ব্যবহারও খুবই ভালো।

সিস্টেম রেস্টুরেন্ট; Source: লেখিকা

লোকেশান

পাংখাইয়া পাড়া, ৪৪০০ খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম।
বাস স্ট্যান্ড বা শহরের যেকোনো মাথা থেকে অটোরিকশাকে সিস্টেম রেস্টুরেন্টে যাবো বলে উঠে পড়লেই পৌঁছে দেবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here